ভারতের বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকায় এক সময় অবহেলিত একটি নীল রঙের ফুল এখন বদলে দিচ্ছে কৃষকদের জীবন। বাটারফ্লাই পি নামে পরিচিত এই ফুল, যা ভারতে অপরাজিতা নামেও পরিচিত, নতুন করে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে বহু কৃষক ও উদ্যোক্তার জন্য।
ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামের আন্থাইগওলাও গ্রামের বাসিন্দা নীলাম ব্রহ্মা বলেন, কয়েক বছর আগেও এই ফুল তার গ্রামে সাধারণ এক ধরনের লতাগাছ হিসেবেই পরিচিত ছিল। পরে তিনি জানতে পারেন, স্থানীয় নারীরা এই ফুল শুকিয়ে চা ও প্রাকৃতিক রং তৈরির কাজে বিক্রি করে আয় করছেন। এরপর তিনিও এই কাজে যুক্ত হন।
নীলাম ব্রহ্মা জানান, প্রথমবার শুকনো ফুল বিক্রি করে প্রায় পঞ্চাশ ডলার আয় করে তিনি নিজেই বিস্মিত হন। এই আয় তাকে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার আত্মবিশ্বাস দেয়। পরে তিনি ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে সৌরচালিত ড্রায়ার কিনে নেন, যা ফুল দ্রুত শুকানো, রং অক্ষুণ্ণ রাখা এবং ক্রেতাদের মানদণ্ড পূরণে সহায়তা করে। এভাবেই তার ছোট উদ্যোগটি একটি ব্যবসায় রূপ নেয়।
বাটারফ্লাই পি ফুলের বড় উৎপাদক ও ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়া পরিচিত। তবে প্রাকৃতিক রঙের বৈশ্বিক চাহিদা বাড়ায় এখন ভারতেও এই ফুল নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। ভোক্তাদের মধ্যে প্রাকৃতিক উপাদানের প্রতি ঝোঁক এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে কৃত্রিম খাদ্যরঙের ওপর কড়াকড়ি এই চাহিদা বৃদ্ধির মূল কারণ।
২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন বাটারফ্লাই পি ফুলকে খাদ্য উপাদান হিসেবে অনুমোদন দেয়। যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্যে এটি এখনও নতুন খাদ্য হিসেবে বিবেচিত এবং পূর্ণ অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। তবুও ভারতীয় উদ্যোক্তারা স্থানীয় বাজার গড়ে তোলার সুযোগ দেখছেন।
প্রাকৃতিক রং ও খাদ্য উপাদান রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান টিএইচএস ইমপেক্সের প্রতিষ্ঠাতা ভারশিকা রেড্ডি বলেন, ভারতে এই ফুল এখনো শৌখিন বা ভেষজ উদ্ভিদ হিসেবেই বেশি পরিচিত। নির্দিষ্ট বাজার কাঠামো, সরকারি শ্রেণিবিন্যাস ও মানসম্মত দাম নির্ধারণ না থাকায় কৃষকেরা আয় নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগেন। তার প্রতিষ্ঠান উত্তরপ্রদেশের নারী কৃষকদের একটি বড় অংশকে নিয়ে চুক্তিভিত্তিকভাবে উৎপাদন বাড়াতে কাজ করছে এবং কৃষি সহায়তা দিচ্ছে।
এদিকে দিল্লির উপকণ্ঠে বসবাসকারী নীতেশ সিং বলেন, গরম পানিতে এই ফুল ভিজালে পানি নীল হয়ে যায় এবং লেবু মেশালে তা বেগুনি রঙ ধারণ করে, যা তার কাছে জাদুর মতো মনে হয়েছিল। এই ভাবনা থেকেই তিনি ২০১৮ সালে ব্লু টি নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। শুরুতে ভারতীয় ফুলের মান ঠিক না থাকায় আমদানি করতে হলেও ধীরে ধীরে কৃষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উৎপাদন ও মান বাড়ানো সম্ভব হয়েছে।
বর্তমানে ব্লু টি দেশের প্রায় ছয়শ কৃষকের সঙ্গে কাজ করছে। ফুল তোলা ও শুকানোর কাজ অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় এই কাজে মূলত নারীরাই যুক্ত থাকেন। সঠিক তাপমাত্রায় শুকানো না হলে ফুলের রং ও গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে জানান সিং।
চোখে পড়ার মতো নীল রঙের পাশাপাশি এই ফুলের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগুণ নিয়েও গবেষণা চলছে। চেন্নাইয়ের শ্রী রামচন্দ্র ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ভি সুপ্রিয়া জানান, প্রিডায়াবেটিক রোগীদের ওপর চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই ফুলের চা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। তবে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের ছোট কৃষক পুষ্পল বিশ্বাস জানান, আগে ধান ও সবজি চাষ করে প্রায়ই লোকসানের মুখে পড়তে হতো। বাটারফ্লাই পি চাষ শুরু করার পর তার উৎপাদন ও আয় দুটোই বেড়েছে। নতুন এই ফসল তাকে জমি বাড়াতে এবং কৃষিকে লাভজনক করতে সহায়তা করেছে।
পুষ্পল বিশ্বাস বলেন, এখন শুধু চাষ নয়, এই ফুলকে ঘিরে একটি কমিউনিটি ও ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, যা বহু মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে।
















