ভারতের গুজরাট রাজ্যের আরব সাগর উপকূলে দাঁড়িয়ে শূন্য দিগন্তের দিকে তাকিয়ে থাকেন রামাকান্ত সিং। একসময় যে আলাং ইয়ার্ডে ঝাঁকে ঝাঁকে জাহাজ ভিড়ত, এখন সেখানে হাতে গোনা কয়েকটি জাহাজ দেখা যায়। তার ভাষায়, আগে ঝড়ের আগের মহিষের মতো জাহাজ সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত, এখন গুনে গুনে জাহাজ আসে।
আলাং হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাহাজ ভাঙার কেন্দ্র। গুজরাটের ভাবনগর জেলায় অবস্থিত এই ইয়ার্ড থেকেই ভারতের প্রায় ৯৮ শতাংশ জাহাজ পুনর্ব্যবহার হয়, যা বৈশ্বিক হিসাবেও প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। গত দুই দশক ধরে রামাকান্তের মতো হাজারো শ্রমিক এখানে বিশাল তেলবাহী ট্যাংকার ও কার্গো জাহাজ কেটে জীবিকা নির্বাহ করেছেন।
১৯৮০-এর দশকে অনন্য জোয়ার-ভাটার বৈশিষ্ট্য ও ঢালু সৈকতের কারণে আলাং হয়ে ওঠে ভারতের জাহাজ রিসাইক্লিং শিল্পের মূলভিত্তি। এখানে কম খরচে জাহাজ তীরে তুলে ভাঙা সম্ভব হতো। কয়েক দশকে ৮ হাজার ৬০০-এর বেশি জাহাজ ভাঙা হয়েছে, যার মোট ওজন প্রায় ৬৮ মিলিয়ন টন।
বিশ্বজুড়ে বর্তমানে প্রায় এক লাখ ৯ হাজার জাহাজ চলাচল করছে, যার প্রায় অর্ধেকই ১৫ বছরের বেশি পুরোনো। প্রতিবছর প্রায় ১ হাজার ৮০০ জাহাজ চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে এবং রিসাইক্লিংয়ের জন্য বিক্রি হয়। এসব জাহাজ আন্তর্জাতিক দালালদের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন ভাঙা কেন্দ্রে পৌঁছায়।
কিন্তু গত এক দশকে আলাংয়ে জাহাজ আসার সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। একসময় দিগন্তজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল জাহাজের বদলে এখন হাতে গোনা কয়েকটি জাহাজ দেখা যায়। আলাংয়ের একটি ইয়ার্ডের মালিক চৈতন কালথিয়া বলেন, আগে সবার জন্য কাজ ছিল, এখন নতুন জাহাজ এলে তবেই অল্প কিছু শ্রমিক ফিরে আসে। তার ব্যবসা আগের তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে।
ভারতের শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১-১২ অর্থবছরে আলাংয়ে সর্বোচ্চ ৪১৫টি জাহাজ ভাঙা হয়েছিল। বর্তমানে ১০ কিলোমিটার উপকূলজুড়ে গড়ে ওঠা ১৫৩টি প্লটের মধ্যে মাত্র ২০টি সচল রয়েছে, তাও ২৫ শতাংশ সক্ষমতায়।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এর অন্যতম কারণ হলো বৈশ্বিক শিপিং বাজারে লাভ বৃদ্ধি। কোভিড-পরবর্তী সময়ে পণ্য পরিবহনের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মালিকরা পুরোনো জাহাজও অবসরে পাঠাচ্ছেন না। গাজায় ইসরায়েলি যুদ্ধ, লোহিত সাগরে নিরাপত্তা সংকট এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিকল্প দীর্ঘ রুটে চলাচল বেড়েছে, ফলে ভাড়া বেড়েছে এবং জাহাজ মালিকরা বেশি আয় করছেন।
এর পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও পরিবেশ মানদণ্ড মানতে গিয়ে আলাংয়ের খরচ বেড়েছে। ২০১৯ সালে ভারত হংকং কনভেনশনে যোগ দেওয়ার পর ইয়ার্ডগুলোকে অবকাঠামো উন্নয়ন, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও শ্রমিক প্রশিক্ষণে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে হয়েছে। প্রতিটি ইয়ার্ডকে গড়ে ৫ লাখ থেকে ১২ লাখ ডলার পর্যন্ত খরচ করতে হয়েছে।
এই বাড়তি খরচের কারণে আলাংয়ের ইয়ার্ডগুলো বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। যেখানে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে প্রতি টন জাহাজের জন্য বেশি দাম দেওয়া হচ্ছে, সেখানে আলাং সেই হার মেলাতে পারছে না। ফলে জাহাজ মালিকরা অন্য দেশকে বেছে নিচ্ছেন।
আলাংয়ের মন্দার প্রভাব শুধু ইয়ার্ডেই সীমাবদ্ধ নয়। আশপাশের এলাকায় গড়ে ওঠা শত শত দোকান, স্টিল রিরোলিং মিল, ফার্নেস ইউনিট, পরিবহন ও ছোট শিল্প প্রতিষ্ঠানেও কাজ কমে গেছে। একসময় যে সড়কজুড়ে ভাঙা জাহাজের যন্ত্রাংশ বিক্রির ভিড় থাকত, এখন সেখানে ক্রেতা হাতে গোনা।
একসময় আলাংয়ে ৬০ হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করতেন। বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ১৫ হাজারের নিচে। অধিকাংশ শ্রমিক কাজ না থাকলে অন্য শহরে চলে যাচ্ছেন এবং নতুন জাহাজ এলে আবার ফিরে আসছেন।
রামাকান্ত বলেন, কাজ এখন আগের তুলনায় অনেক নিরাপদ হয়েছে, কিন্তু নিরাপত্তার চেয়েও বড় সমস্যা হলো কাজের অভাব। তার কথায়, সবকিছু এখন নির্ভর করছে পরের জাহাজটি আদৌ তীরে ভিড়বে কি না, তার ওপর।
















