সান্তিয়াগোর কেন্দ্রে একটি বেঞ্চে বসে ৬২ বছরের ফের্নান্দো কাররাস্কো অস্থির চোখে চারপাশে তাকান। পাশের আসনে বড় ব্যাগ নিয়ে বসা এক লোকের দিকে তার দৃষ্টি সজাগ, হাত শক্ত করে চেপে রাখা মোবাইল। তিনি ধীর গলায় বলেন, রাত নামলে শহরের রাস্তায় আর হাঁটা যায় না। বাসে, মেট্রোতে—সবখানে আতঙ্ক। “আগে এমন ছিল না,” তার কণ্ঠে নিঃশ্বাসের মতো দীর্ঘশ্বাস।
চিলির জনগণের এই শঙ্কাই দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কেন্দ্রীয় ইস্যু হয়ে উঠেছে। রবিবার ভোটাররা সিদ্ধান্ত নেবেন দুই প্রার্থীর মধ্যে—দূর-ডানপন্থী আইনপ্রণেতা হোসে আন্তোনিও কাস্ত এবং মধ্য-বাম জোটের কমিউনিস্ট প্রার্থী, সাবেক শ্রমমন্ত্রী জিয়ানেত্তা হারার মধ্যে।
কিন্তু প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন একটাই: নিরাপত্তাহীনতার গভীর হওয়া ছায়া।
একাধিক জরিপ দেখাচ্ছে, চিলির ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ অপরাধ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি বিশ্বব্যাপী সেই দেশগুলোর তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছে, যাদের জনগণ সবচেয়ে বেশি সহিংসতার ভয়ে থাকে। ইপসস গবেষণায় দেখা গেছে, চিলির ৬৩ শতাংশ মানুষ অপরাধ নিয়ে ভীত—বিশ্ব গড়ের দ্বিগুণ।
পাজ সিউদাদানা সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক ড্যানিয়েল জনসন বলেন, “চিলি আজ বিশ্বের অন্যতম ভীত দেশ।”
কাস্ত এই ভয়ের ঢেউকেই রাজনৈতিক মূলধনে রূপ দিতে চাইছেন। তার প্রচারে প্রতিশ্রুতি—“সংগঠিত অপরাধ দমন, শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং চিলির মানুষকে ভয়মুক্ত জীবন ফিরিয়ে দেয়া।”
কিন্তু অপরাধের বাস্তবতা আর মানুষের উপলব্ধির মধ্যে বিশাল ব্যবধান রয়েছে। চিলি আসলে লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে নিরাপদ দেশগুলোর একটি। ২০২৪ সালে এখানে প্রতি লাখে হত্যা ছিল মাত্র ৬ জন—যেখানে প্রতিবেশী ইকুয়েডরে সেই হার ৪৬।
তারপরও মানুষের অনুভূত ভয় বাড়ছে। “আগে আমাকে ছিনতাই করত, এখন তারা আমাকে হত্যা করে”—এমন বাক্য এখন লোকমুখে, যদিও তথ্য তা প্রমাণ করে না।
জনসন জানান, কোভিড-পরবর্তী সময়ে সহিংসতা কিছুটা বেড়েছিল, বিশেষত অপহরণ ও খুনের ঘটনা। এর পেছনে উঠে আসে আন্তঃদেশীয় অপরাধচক্রের প্রভাব—যাদের শেকড় লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার কুখ্যাত গ্যাং ত্রেন দে আরাগুয়ার আগ্রাসন চিলির নিরাপত্তাবোধে বড় আঘাত।
আরিকাসহ সীমান্ত এলাকার শহরগুলোতে তারা প্রভাব বিস্তার করে, লক্ষ্যবস্তুতে রাখে ভেনেজুয়েলা থেকে আগত অভিবাসীদের। পুলিশ সদস্যদের ওপর আক্রমণ, নির্মম হত্যাকাণ্ড—সব মিলিয়ে জনমনে গভীর আতঙ্ক ছড়ায়। ২০২৪ সালে ভেনেজুয়েলার সাবেক সামরিক কর্মকর্তা রোনালদ ওহেদা মোরেনোর অপহরণ ও হত্যা দেশটিকে নাড়িয়ে দেয়।
এমন পরিস্থিতিতে কাস্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি নজরবন্দি ও সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কারাগারে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাখাসহ বড় সাজা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পাশাপাশি আত্মরক্ষার আইনী সংজ্ঞা বিস্তারের কথাও বলেছেন—যাতে সাধারণ মানুষ অভিযুক্ত না হয়ে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।
জিয়ানেত্তা হারা অন্যদিকে অপরাধ দমনের মূল উৎসে আঘাত হানার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—কার্টেলগুলোর আর্থিক নেটওয়ার্ক ভেঙে ফেলা। তার মতে, “জেল বাড়ালেই হবে না। অপরাধীরা এসেছে টাকায়—তাই তাদের অর্থের পথ বন্ধ করতে হবে।”
চিলির ১ কোটি ৫৮ লাখ নিবন্ধিত ভোটারের সবার জন্যই এবার ভোট বাধ্যতামূলক। বিশ্লেষকদের ধারণা, কাস্ত এগিয়ে থাকলেও হারাও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী, বিশেষত যারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পেনশনসহ সামাজিক ইস্যুকে বেশি গুরুত্ব দেন—তাদের সমর্থন তার দিকে।
তবে জনসন সতর্ক করেন, অতিরিক্ত ভয় সমাজে বড় ক্ষতি ডেকে আনে। থিয়েটার, রেস্তোরাঁ, শিল্পকলা—সবকিছুর ওপর তার প্রভাব পড়ে। অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তার কথায়, “ভয় খুবই ক্ষতিকর। কখনো কখনো বাস্তব অপরাধের চেয়েও বেশি বিধ্বংসী।”
















