ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত তথাকথিত ‘মুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল’ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তার মতে, ওয়াশিংটন ডনেস্কের কিছু অংশ থেকে ইউক্রেনীয় সেনা প্রত্যাহারের বিনিময়ে একটি বাফার অঞ্চল গড়ে তুলতে চায়, যেখানে রুশ বাহিনী প্রবেশ না করলেও কে এই এলাকার দায়িত্ব নেবে তা এখনও পরিষ্কার নয়।
জেলেনস্কি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইউক্রেন একটি ২০ দফা পাল্টা শান্তি প্রস্তাব তুলে ধরেছে, যেখানে যেকোনো ধরনের ভূখণ্ডগত সমঝোতার সিদ্ধান্ত জনগণের ভোটে নির্ধারণের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ওয়াশিংটন যেটিকে “অর্থনৈতিক মুক্ত অঞ্চল” বলে ব্যাখ্যা করছে, রাশিয়া সেটিকেই “অসামরিক অঞ্চল” হিসেবে দেখছে। তবে জেলেনস্কির দাবি—এই সিদ্ধান্ত জনগণের, এবং জনগণের মতামত ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার চাপ বাড়ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বড়দিনের আগেই কোনো একটি চুক্তি চূড়ান্ত করতে চান। নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, পুনর্গঠন পরিকল্পনা এবং যুদ্ধবিরতির রূপরেখা—সব মিলিয়ে জটিল আলোচনার মধ্যে রয়েছে কিয়েভ।
জেলেনস্কি জানান, ডনেস্কের যে অংশটি এখনো ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে, তা থেকে সেনা প্রত্যাহারের প্রস্তাব একতরফা হতে পারে না। তিনি প্রশ্ন করেন, শুধুই কেন ইউক্রেন পিছিয়ে যাবে; বিপরীত দিক থেকেও সমান দূরত্বে সেনা সরানোর প্রয়োজন রয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে বৈঠকের পর জেলেনস্কি বলেন, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চয়তার নথিতে অবশ্যই সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ থাকতে হবে—যাতে রাশিয়া আবার আক্রমণে নামলে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো হবে তা পরিষ্কার থাকে।
এদিকে, ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে ইউরোপকে সতর্ক করে বলেন, পাঁচ বছরের মধ্যেই রাশিয়া জোটের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগে প্রস্তুত হয়ে উঠতে পারে। তার ভাষায়, “সংঘাত আমাদের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে।” তিনি দ্রুত প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর তাগিদ দেন।
একই সময়ে, ইউরোপীয় কমিশন রাশিয়ার প্রায় ২০০ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্থগিত সম্পদ ইউক্রেনের জন্য ব্যবহারের চেষ্টা করছে। যদিও এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি এবং বেলজিয়াম আইনি জটিলতার আশঙ্কা করছে।
যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপকে কিছুটা পাশ কাটিয়ে সরাসরি মস্কো-কিয়েভের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে—এমন অভিযোগও উঠছে। তবে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্ক এবং ন্যাটো প্রধান রুটে জানান, ইউরোপকে যে কোনো সম্ভাব্য আলোচনায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখতেই হবে।
মস্কো দাবি করছে, যুদ্ধক্ষেত্রে তারা এখন “কৌশলগত নেতৃত্বে” রয়েছে। রুশ সেনারা সিভেরস্ক শহর দখল করেছে বলে ক্রেমলিন জানালেও কিয়েভ তা অস্বীকার করছে। ইউক্রেন জানিয়েছে, প্রতিকূল আবহাওয়ার সুযোগ নিয়ে রুশ সেনারা ছোট ছোট দলে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে, কিন্তু বেশিরভাগকেই প্রতিহত করা হয়েছে।
এদিকে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় ক্যাসপিয়ান সাগরে লুকওয়েলের একটি তেল রিগে আগুন লাগে বলে জানা গেছে, যা রাশিয়ার জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা হতে পারে।
মস্কোর চারটি বিমানবন্দরও ড্রোন হানায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্ধ ছিল। যুদ্ধের এই দীর্ঘ ক্লান্তি ও অনিশ্চয়তার মাঝে জেলেনস্কি বলেন, দেশে নির্বাচন আয়োজনের জন্য একটি যুদ্ধবিরতি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
তার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে চাপ বাড়ছে, আর এর মধ্যেই চলছে এক অস্থির শান্তি-সম্ভাবনার আলোচনার পথচলা। ইউক্রেনের রাতগুলো আরও দীর্ঘ, আর প্রান্তসীমায় ঝুলে আছে—যুদ্ধ, শান্তি আর জনগণের সিদ্ধান্তের অপেক্ষামান ভবিষ্যৎ।
















