বাংলাদেশে দীর্ঘ টানাপোড়েন আর উত্তাল রাজনীতির পরে অবশেষে ঘোষিত হলো জাতীয় নির্বাচনের দিন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন—যা হবে সেই প্রথম ভোট, যেদিনের প্রতীক্ষায় ছিল গোটা দেশ, গত বছরের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় টেলিভিশন ভাষণে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন জানিয়ে দেন নির্বাচনের তারিখ। একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে জাতীয় গণভোট—এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত, যা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র কাঠামো পুনর্গঠনের পথ নির্দেশ করতে পারে।
এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো, যখন নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এখনও সংগ্রাম করছে স্থিতি ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে। ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার দল এখনও নির্বাচনের বাইরে; তাদের নেতারা সতর্ক করেছেন, পরিস্থিতি যে কোনো সময় আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।
ইউনুস অবশ্য নির্বাচন সূচিকে দেখছেন নতুন যাত্রার মাইলফলক হিসেবে। তাঁর ভাষায়, “ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দোরগোড়ায় পৌঁছেছে।”
কিন্তু উত্তাল পরিস্থিতি আরও জটিল হলো বৃহস্পতিবারই, যখন বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন জানান—ভোটের পর তিনি পদত্যাগ করতে চান। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তিনি ‘অপমানিত’ বোধ করেছেন, আর সরে দাঁড়াতেই চান।
দেশের সাধারণ মানুষের ভাবনায় এখন মূল বিষয় হচ্ছে গণতান্ত্রিক শাসন পুনরুদ্ধার, পোশাকশিল্পের গতি ফিরিয়ে আনা এবং ভারতের সঙ্গে টানাপোড়েন কমানো—যে সম্পর্ক উত্তপ্ত হয়েছিল হাসিনার দেশত্যাগের পর।
ভোটযাত্রা আরও রঙিন হবে ‘জুলাই চার্টার’ নামের সংস্কার-নকশা নিয়ে গণভোটের কারণে। এই প্রস্তাবনায় আছে নির্বাহী ক্ষমতা কমানো, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আরও জোরদার করা, নির্বাচন কমিশনের শক্তি বাড়ানো এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর রাজনৈতিক অপব্যবহার রোধ।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটার ভোট দেবেন ৪২ হাজারের বেশি কেন্দ্রে, ৩০০টি আসনের জন্য।
রাজনৈতিক ময়দানে এবার নেতৃত্বে থাকবে বিএনপি—খালেদা জিয়ার দল। তাদের সঙ্গে আছে জামায়াতে ইসলামী, যারা ২০১3 সালের রায়ের পর প্রথমবার ফের নির্বাচনী মাঠে নামছে। তবে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের নতুন দল ‘ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি’ এখনও জনসমর্থনকে সংগঠনে রূপ দিতে লড়ছে।
বিএনপি ইতোমধ্যে বিচ্ছিন্ন হয়েছে জামায়াতের পুরোনো জোট থেকে, নিজেকে তুলে ধরছে উদার ও গণতান্ত্রিক বিকল্প হিসেবে—হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশের নতুন সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে।
বাংলাদেশ এখন যেন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে—অতীতের ক্ষত নিয়ে, ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুকে নিয়ে—একটি নির্বাচনের অপেক্ষায়, যার ফলাফল বদলে দিতে পারে জাতির পথরেখা।
















