যে দিনের অপেক্ষায় ছিল দেশ—সেই দিনের দুয়ার আজ খুলে যাচ্ছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার সব আয়োজন সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন। ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ গতকাল জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ছয়টার পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে তফসিল ঘোষণা করবেন।
এর আগে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে শিষ্টাচার সাক্ষাৎ সেরে কমিশনাররা সন্ধ্যায় সিইসির রেকর্ড করা ভাষণের কাজ শেষ করেন। ইসির নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণের দিন নির্ধারিত হয়েছে।
এ নির্বাচন শুধু একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়—এ যেন বহু বছরের প্রত্যাশা, বঞ্চনা আর ক্ষত-বিক্ষত গণতন্ত্রের পুনর্জন্মের আকাঙ্ক্ষা। একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গণভোট নির্ধারণ করবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রূপরেখা, সংবিধান সংশোধনের পথচিত্র। ২০০৮ সালের পর দেশের মানুষ ভোটের স্বাধীন স্বাদ আর পায়নি। ২০১৪, ২০১৮ আর ২০২৪—পরপর তিনটি নির্বাচনই ছিল একতরফা; ভোটের মাঠে জনতার কণ্ঠস্বর ছিল দমিয়ে রাখা। তিন কোটি তরুণ ভোটার এখনও তাদের জীবনের প্রথম ভোটও দিতে পারেনি। সেই দীর্ঘ দমবন্ধ অন্ধকারের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে পতন ঘটে ফ্যাসিস্ট সরকারের; শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
তারপরের জুলাই বিপ্লব বদলে দেয় দেশের পথচলা। অন্তর্বর্তী সরকারের তত্ত্বাবধানে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে দেশজুড়ে বইছে নতুন আশার হাওয়া। রাজনৈতিক দলগুলো ইতোমধ্যে প্রার্থী ঘোষণা করেছে; মাঠে নেমেছে প্রচারণা, ব্যস্ততার তীব্র স্পন্দনে জেগে উঠছে গ্রাম-শহর। আন্তর্জাতিক মহলের চোখও তাকিয়ে আছে এ নির্বাচনের ওপর।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস গতকাল ইউএনওদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে বলেন, ইতিহাস নতুন করে এক সুযোগ তুলে দিয়েছে। এই নির্বাচন হতে হবে শান্তিপূর্ণ, স্মরণীয়—যা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে গৌরব হয়ে থাকবে।
৮ ডিসেম্বর সারা দেশের নির্বাচন কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠকে সিইসি নাসির উদ্দিন বলেন, বিগত সময়ের ক্ষতিগ্রস্ত ভাবমূর্তিকে ফিরিয়ে আনতেই হবে। অনিয়মের ছায়া যতটুকুই থাকুক, নির্মমভাবে তা দূর করা হবে। যে কর্মকর্তা অনিয়মে যুক্ত হবেন, প্রমাণ মিললেই সরিয়ে দেওয়া হবে।
এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারছে না। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় এবং দলটির নিবন্ধন স্থগিত থাকায় তারা ভোটের বাইরে। আরপিও সংশোধনের ফলে শেখ হাসিনাসহ দলটির বেশ কয়েকজন নেতা নির্বাচনে অযোগ্য হয়েছেন। জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলীয় জোটের শরিকেরা চাইলে অংশ নিতে পারবে। বিশ্লেষকদের ধারণা, আওয়ামী লীগ না থাকলেও এবারের ভোটে ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যাবে, অন্তত ৭০ শতাংশ ভোট পড়তে পারে। তরুণরা ভোটাধিকার প্রয়োগে মুখিয়ে আছে।
নতুন তালিকা অনুযায়ী দেশে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন—পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২, তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২৩৪। এক দিনে নির্বাচন ও গণভোট হওয়ায় প্রতিটি কেন্দ্রে দুইটি করে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে; যেসব কেন্দ্রে জায়গা কম, সেখানে বাড়তি ভোটকেন্দ্র গড়া হবে। এবার ভোটকেন্দ্র হয়েছে ৪২ হাজার ৭৬১টি, আর ভোটকক্ষ ২ লাখ ৪৪ হাজার ৬৪৯টি।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, বিজিবি, আনসারসহ প্রায় ৭ লাখ ৬৮ হাজার সদস্য মাঠে থাকবেন, সঙ্গে থাকবে প্রায় ৮০ হাজার সেনা সদস্য। নতুন দল নিবন্ধন, পর্যবেক্ষক অনুমোদন, সীমানা পুনর্নির্ধারণ, আইন সংস্কার, ভোটার তালিকা হালনাগাদ, প্রবাসীদের জন্য আইটি-সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট—সবকিছুই ইসির প্রস্তুতিকে আরও পূর্ণ করেছে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানান, তফসিল ঘোষণার পর লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করাই প্রথম দায়িত্ব। নিরাপত্তাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—কারণ একটি স্থিতিশীল ও নিরাপদ পরিবেশ ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।
















