গত এক সপ্তাহ ধরে ভারতের আকাশপথে তীব্র বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে, কারণ দেশটির সবচেয়ে বড় বেসরকারি বিমানসংস্থা ইন্ডিগো ২ ডিসেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৫০০-র বেশি ফ্লাইট বাতিল করেছে। ব্যস্ত ভ্রমণ মৌসুমে এই বিপর্যয়ে হাজারো যাত্রী বিভিন্ন বিমানবন্দরে আটকা পড়েছেন।
প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে নতুন পাইলট বিশ্রাম ও দায়িত্বসংক্রান্ত নিয়ম—ফ্লাইট ডিউটি টাইম লিমিটেশনস (এফডিটিএল)—যা গত বছর সরকার চালু করলেও ইন্ডিগো সময়মতো প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হয়। প্রতিদিন প্রায় ২,২০০ ফ্লাইট পরিচালনাকারী এ সংস্থাটি নতুন বিধির কারণে পাইলট সংকটে পড়লে ব্যাপক দেরি ও বাতিলের ঘটনা বাড়তে থাকে।
গত শুক্রবার একদিনে অন্তত ১,০০০ ফ্লাইট বাতিল হয়, যা ভারতের বিমান পরিবহন খাতে অন্যতম বড় সংকট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শনিবার ৮৫০ এবং রবিবার ৬৫০-র বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়। দিল্লি, মুম্বাই, হায়দরাবাদ ও বেঙ্গালুরুতে সবচেয়ে বেশি বিঘ্ন দেখা গেছে।
সরকার হস্তক্ষেপ করলেও পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হয়নি। ইন্ডিগোকে নতুন নিয়মের কিছু অংশে ছাড় দেওয়া হয়েছে, এবং সরকার আটকা পড়া যাত্রীদের ট্রেনের টিকিটও দিয়েছে। তবু সোমবার দিল্লি, চেন্নাই ও বেঙ্গালুরুতে আরও ৩০০-এর বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়। সংস্থাটি জানিয়েছে, ১০-১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।
নতুন এফডিটিএল বিধিতে পাইলটদের সাপ্তাহিক বাধ্যতামূলক বিশ্রাম ৩৬ ঘণ্টা থেকে বাড়িয়ে ৪৮ ঘণ্টা করা হয়েছে, রাতভর ফ্লাইটে ডিউটি সর্বোচ্চ ১০ ঘণ্টায় সীমিত রাখা হয়েছে, এবং মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত সাপ্তাহিক ল্যান্ডিং সর্বোচ্চ দু’বার করার নিয়ম আনা হয়েছে। পাশাপাশি, ক্লান্তির রিপোর্ট নিয়মিত জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যথেষ্ট প্রস্তুতির সময় থাকা সত্ত্বেও ইন্ডিগো নতুন বিধির জন্য পর্যাপ্ত পাইলট নিয়োগ করেনি, বরং নিয়োগ স্থগিত, বেতন স্থির রাখা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থাগুলোর সঙ্গে পাইলট না নেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত ইন্ডিগোকে সংকটে ফেলেছে।
সরকার বিষয়টি তদন্তে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। বেসামরিক বিমান পরিবহনমন্ত্রী কিনজারাপ্পু রামমোহন নাইডু বলেছেন, অন্যান্য সংস্থার তুলনায় ইন্ডিগোর “ক্রু ব্যবস্থাপনার ত্রুটি” বেশি। ইন্ডিগো যদিও পুরো দায় স্বীকার করে বলেছে, এটি “পরিকল্পনায় ভুলের ফল”।
ডিজিসিএ ইন্ডিগোকে সতর্ক করে জানিয়েছে, অব্যাহত বিশৃঙ্খলার দায়ে নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। টিকিটের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সরকার ভাড়ার ওপরও সীমা আরোপ করেছে। দেশের অভ্যন্তরীণ রুটে ১,০০০ থেকে ১,৫০০ কিলোমিটার যাত্রার জন্য সর্বোচ্চ ভাড়া ১৫,০০০ রুপি নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, এয়ার ইন্ডিয়া ও আকাসা এয়ার নতুন বিধি মানতে আগেই পাইলট সংখ্যা বাড়ায় এবং তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক সেবা বজায় রাখতে পেরেছে। তবে ইন্ডিগোর বাজার নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা—মোট বাজারের প্রায় ৬৫ শতাংশ—নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একক সংস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা পুরো দেশকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধী ইন্ডিগো সংকটকে সরকারের “মনোপলি মডেলের” ব্যর্থতা বলেছেন। তবে সরকার বলেছে, তারা বরাবরই বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে কাজ করে আসছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিযোগিতা কমে যাওয়া, উচ্চ জ্বালানি কর, এবং আগের বহু বেসরকারি এয়ারলাইনের বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে যাত্রীদের বিকল্প কমে গেছে, যা পুরো বিমান খাতকে আরও দুর্বল করে তুলেছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ইন্ডিগো জানিয়েছে, যাত্রীদের টিকিট বাতিল ও সময় পরিবর্তনে পূর্ণ ছাড় দেওয়া হবে, এবং ধীরে ধীরে ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। বর্তমানে সংস্থাটি বলছে, তাদের ১৩৮টি গন্তব্যের মধ্যে ১৩৭টি পুনরায় সচল হয়েছে।
















