শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা তরুণদের দল এনসিপি জনআশার পরও সংগঠনঘাটতি, অর্থাভাব ও স্পষ্ট অবস্থানহীনতায় চ্যালেঞ্জে—বিএনপি ও জামায়াতের ছায়ায় জোট ভাবনায় নতুন দ্বিধা
রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে—হাসিনাবিরোধী অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল এনসিপি এখন রাজনীতিতে টিকে থাকার লড়াইয়ে। জরিপে তৃতীয় স্থানে থাকা দলটি দুর্বল সংগঠন, অর্থাভাব ও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে স্পষ্ট অবস্থান দিতে না পারায় চাপে পড়েছে। জোট আলোচনা, জনআশা, সমর্থনহ্রাস এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা—সবই উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।
শেখ হাসিনাবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়া তরুণ নেতাদের নতুন রাজনৈতিক দল—জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)—রাজনীতির কঠিন বাস্তবতায় টিকে থাকতে সংগ্রাম করছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও সংগঠন দুর্বলতা, অর্থসংকট, স্থানীয় নেটওয়ার্কের অভাব এবং গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে স্পষ্ট অবস্থান দিতে দ্বিধায় থাকার কারণে তারা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
ঢাকার বাংলামোটরের কার্যালয়ে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম স্বীকার করেন—দলটি দ্রুত জনপ্রিয় হলেও সংগঠন গড়ে তোলার পর্যাপ্ত সময় তারা পায়নি। গত বছরের অভ্যুত্থান-পরবর্তী মুহূর্তে দেশের রাজনৈতিক সম্ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও বাস্তব রাজনীতির মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় তাদের প্রস্তুতি দুর্বল।
জনমত জরিপে দেখা যায়, জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দেওয়া এনসিপি ভোটার পছন্দে মাত্র ৬ শতাংশ সমর্থন পাচ্ছে, যেখানে বিএনপি ৩০ শতাংশ নিয়ে শীর্ষে এবং জামায়াতে ইসলামী ২৬ শতাংশ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে।
গত বছরের আন্দোলনের অন্যতম মুখ প্রাপ্তি তাপসীসহ অনেক তরুণ এখন দলটির কর্মকাণ্ডে হতাশ। তাপসী বলেন, এনসিপি নিজেদের মধ্যপন্থি বলে দাবি করলেও সংখ্যালঘু অধিকার, নারী অধিকারসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সময়োপযোগী অবস্থান নিতে দেরি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু নির্বাচনে একটি পদও না পাওয়া দলটির জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন আরও বাড়িয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রয়োজনীয় কাঠামো ও সংগঠন না থাকায় এনসিপিকে বিএনপি, জামায়াত বা অন্য দলগুলোর সঙ্গে জোট নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। তবে জোটে গেলে দলটির ‘বিপ্লবী’ ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, জোট করলে এনসিপিকে আর স্বাধীন নতুন শক্তি হিসেবে দেখা হবে না।
অর্থসংকটও এনসিপির বড় সমস্যা। অনেক নেতা ব্যক্তিগত বেতনের ওপর ভর করে প্রচার–প্রচারণা চালাচ্ছেন। তৃণমূলে নেতারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সমর্থন ও অনুদান সংগ্রহ করছেন। একই সঙ্গে দলের কিছু নেতার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ সংগঠনের ওপর চাপ বাড়িয়েছে, যদিও এনসিপি অভিযোগ অস্বীকার করে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণের কথা জানিয়েছে।
তবুও তরুণদের একটি অংশ এখনও বিশ্বাস করেন—এনসিপিই রাজনীতিতে নতুন সংস্কৃতি আনতে পারে। তাদের মতে, অর্থ ও বংশানুক্রমিক ক্ষমতার প্রভাবমুক্ত নতুন রাজনীতি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা এই দলের মাধ্যমেই সম্ভব। এনসিপির ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবে দেখা যাচ্ছে সারাদেশে খোলা সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা; যেখানে অংশ নিয়েছেন রিকশাচালক থেকে শুরু করে আন্দোলনে আহত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা।
এনসিপির তরুণ নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের চেয়ে বড় লক্ষ্য হলো রাজনৈতিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনা। তার ভাষায়—“হারি বা জিতি, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়েই আমরা নতুন কিছু আনছি।”
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই তরুণ দলটি ভবিষ্যতে কী পরিবর্তন আনতে পারে, সে দিকে তাকিয়ে আছে দেশ-বিদেশের পর্যবেক্ষক মহল।
















