লেবাননের আকাশে আবারও অশান্তির কালো ছায়া। এমন পরিস্থিতিতে বৈরুতের পূর্বাঞ্চলে বাবদা প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেসে রাষ্ট্রপতি জোসেফ আওন সাক্ষাৎ করলেন একটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ (UNSC) প্রতিনিধি দলের সঙ্গে। আলোচনার কেন্দ্র ছিল সীমান্তজুড়ে বাড়তে থাকা ইসরায়েলি আগ্রাসন এবং হিজবুল্লাহ নিরস্ত্রীকরণ ইস্যু। মাত্র একদিন আগেই দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর তীব্র হামলায় দেশের সীমান্ত অঞ্চল কেঁপে উঠেছিল।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা NNA জানায়, আওন প্রতিনিধি দলের কাছে স্পষ্টভাবে দাবি তোলেন—ইসরায়েল যেন ২০২৪ সালের নভেম্বরে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে চলে, যা প্রায় প্রতিদিনই লঙ্ঘন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, দক্ষিণ লেবাননের যেসব এলাকা ইসরায়েল এখনও দখল করে রেখেছে, সেখান থেকে তাদের অবিলম্বে সরে যেতে হবে।
আওন জানান, জাতিসংঘ দলটি প্রধানমন্ত্রী নবাব সালাম এবং পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেররির সঙ্গেও বৈঠক করেছে। এরপর তারা দক্ষিণ লেবানন ঘুরে বাস্তব পরিস্থিতি দেখে আসবে—যেখানে সেনাবাহিনী হিজবুল্লাহর অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করছে।
এদিকে, এই উচ্চপর্যায়ের সফরের মাঝেই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে হিজবুল্লাহ। বহু দশক পর লেবানন ও ইসরায়েলের বেসামরিক প্রতিনিধিদের সরাসরি বৈঠককে হিজবুল্লাহর উপপ্রধান নাঈম কাসেম আখ্যা দিয়েছেন “ফ্রি কনসেশন”—একটি বিনা কারণে শত্রুর সামনে মাথানত করা। তার অভিযোগ, এমন উদ্যোগ রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং লেবাননের সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করে।
তিনি আরও বলেন, ইসরায়েল কখনোই যুদ্ধবিরতি মানেনি। তাদের হামলা চলছে অবিরত, যেন ধীরে ধীরে লেবাননের ভূখণ্ড দখল করে ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ গঠনের স্বপ্ন পূরণ করতে চায়। যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও কাসেম ক্ষোভ প্রকাশ করেন—তার অভিযোগ, ওয়াশিংটনের লেবাননের অভ্যন্তরীণ নীতি বা প্রতিরক্ষা সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকার নেই।
যদিও প্রধানমন্ত্রী সালাম বলেন, আলোচনাটি ছিল শুধুই যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নভিত্তিক এবং কোনও ভাবেই স্বাভাবিকীকরণ বা রাজনৈতিক সমঝোতার দিকে ইঙ্গিত করে না।
কিন্তু কূটনীতির এই ক্ষীণ আলো আবারও ঢেকে দিল ইসরায়েলি আক্রমণের ধোঁয়া। বৃহস্পতিবার দক্ষিণ লেবাননের অন্তত চারটি গ্রামে হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। বছরের পর বছর ধরে চলা শত শত হামলার ধারাবাহিকতায় এই আঘাতে বহু ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে, প্রাণহানিও ঘটেছে। আল জাজিরার বৈরুত প্রতিনিধি জানান—বার্তা ছিল পরিষ্কার, “আলোচনা চলবে আগুনের নিচে, যতক্ষণ না হিজবুল্লাহ সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণে বাধ্য হয়।”
হামলার মধ্যে গত মাসে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে হিজবুল্লাহর সামরিক প্রধান হাইসম আলী তাবাতাবাইকে হত্যার দায়ও অস্বীকার করেনি ইসরায়েল। কাসেম বলেন, এই “নৃশংস অপরাধের” জবাব দেওয়ার অধিকার হিজবুল্লাহর আছে, এবং তারা নিজস্ব সময়ে প্রতিক্রিয়া জানাবে।
অন্যদিকে, তথ্যমন্ত্রী পল মোরকোস জানান, সরকারের দৃষ্টিতে ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনার পথই একমাত্র উপায়। রাষ্ট্রপতি আওন মন্ত্রিসভা বৈঠকে বলেন, ইতিহাস দেখিয়েছে—যুদ্ধ কখনো স্থায়ী সমাধান দেয় না; আলোচনার ভাষাই টেকসই পথ, তবে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনও ছাড় নয়।
যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী লেবানন সীমান্তে সশস্ত্র হামলা ঠেকানোর দায়িত্বে, আর ইসরায়েলের প্রতিশ্রুতি—আক্রমণ বন্ধ রাখা। কিন্তু বাস্তবে ইসরায়েল এখনও লেবাননের অন্তত পাঁচটি স্থানে অবস্থান করছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক আক্রমণে ইতিমধ্যে তিন শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে ১২৭ জনের বেশি সাধারণ নাগরিক।
ইসরায়েল দাবি করছে, তাদের হামলা হিজবুল্লাহর সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে, যাতে তারা পুনর্গঠিত হতে না পারে—কিন্তু বাস্তবতা বলছে, সীমান্তের ওপারে প্রতিদিনই বাড়ছে শোক, ক্ষোভ এবং অনিশ্চয়তার অন্ধকার।
দক্ষিণ লেবাননের নীরব গ্রামগুলো আজ যেন প্রশ্ন তোলে—আলোচনার আলো কি যুদ্ধের আগুনকে নিভিয়ে দিতে পারবে? অথবা আগুনই কি আলোকে গ্রাস করে ফেলবে?
















