পাকিস্তান জানিয়েছে, বাংলাদেশ ও চীনের সঙ্গে গড়ে ওঠা ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে। আঞ্চলিক অস্থিরতার এই সময়ে ইসলামাবাদ ইঙ্গিত দিয়েছে—দক্ষিণ এশিয়ার নতুন মানচিত্র তারা নতুনভাবে আঁকতে চায়, যেখানে ভারতের প্রভাব কমে আসবে বা সীমিত থাকবে।
ইসলামাবাদ কনক্লেভে পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার বলেন, শূন্য-ফলাফলের রাজনীতি পাকিস্তান কখনো সমর্থন করে না। তাঁর ভাষায়, “সহযোগিতার দরজাই আমাদের ভবিষ্যৎ। মোকাবিলা নয়, মিলনের পথই সমাধান।”
এই ধারণা মূলত এক নতুন আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মের কথা বলে—যা একটি বিকল্প SAARC-এর মতো হতে পারে, তবে ভারতকে কেন্দ্রের বাইরে রেখে। দীর্ঘদিনের ভারত-পাকিস্তান বৈরিতার মধ্যেই SAARC কার্যত অচল হয়ে পড়েছে, আর তাই ইসলামাবাদের চোখে এটি সুযোগের মুহূর্ত।
চীন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের কূটনীতিকরা জুন মাসে বৈঠক করেন, যেখানে আঞ্চলিক স্থিতি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানুষের জীবনমান উন্নত করার বিষয়ে আলোচনা হয়। তাঁরা বলেছিলেন—এই সহযোগিতা “কারও বিরুদ্ধে নয়।”
তবে আঞ্চলিক উত্তেজনার বর্তমান পরিস্থিতি এই নীরব বার্তাকে আরও জোরালো করে তুলেছে। পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে গত মে মাসে চার দিনের সংক্ষিপ্ত বিমানযুদ্ধ দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ককে আরও তলানিতে ঠেলে দিয়েছে।
অন্যদিকে ঢাকাও দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের কঠিন অধ্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে। গত বছর আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন ও ভারতে আশ্রয় নেন। পরবর্তীতে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার পরও তাঁকে ফেরত পাঠাতে ভারতের অস্বীকৃতি দুই দেশের দূরত্ব বাড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন ওঠে—দক্ষিণ এশিয়ার অন্য রাষ্ট্রগুলো কি এমন একটি জোটে যোগ দেবে, যেখানে ভারতের প্রভাব ক্ষীণ বা অনুপস্থিত রাখার উদ্দেশ্য স্পষ্ট?
এই প্রস্তাবের কেন্দ্রবিন্দুতে মূল ধারণা হলো—অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও সংযোগের মতো ক্ষেত্রে নতুন সহযোগিতার দরজা খোলা। দারের মতে, জাতীয় স্বার্থকে অন্য কারও কঠোরতার কাছে বন্দি রাখা চলে না। ইঙ্গিতটি যে ভারতের দিকে—তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই প্রস্তাব এখনো বেশি স্বপ্নের মতো। লাহোর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাবিয়া আখতার বলেন, SAARC নিস্ক্রিয় থাকায় পাকিস্তান আঞ্চলিক সহযোগিতার কাঠামোকে নতুন করে ভাবছে—এটি এক ধরনের বার্তা।
১৯৮৫ সালে ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করা SAARC আজ কার্যত স্থবির। ভারত-পাকিস্তান বৈরিতা সংগঠনটির হৃদয়টিকেই থামিয়ে দিয়েছে। ২০১৬ সালের সম্মেলন বাতিল হওয়ার পর থেকে SAARC আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। অথচ দুই দেশের দূরত্ব কমলে SAARC দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হতে পারত—বিশেষজ্ঞদের এমন মতই রয়ে গেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার দুই বিলিয়নেরও বেশি মানুষের জন্য অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য মাত্র ৫ শতাংশ—এটি অঞ্চলের অনুন্নত সংযোগ ও রাজনৈতিক সংকটের কঠিন প্রতিফলন। ভারত-পাকিস্তান বাণিজ্য তো আরও নগণ্য—আধिकारिक অঙ্কে একসময় ২.৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ালেও ২০২৪ সালে তা নেমেছে মাত্র ১.২ বিলিয়নে।
বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালের BBIN, অথবা BIMSTEC-এর মতো বিকল্প জোটগুলো ইতোমধ্যেই দেখিয়ে দিয়েছে—SAARC-এর বাইরে সহযোগিতা সম্ভব। তবে তা মূলত দ্বিপাক্ষিক বা ত্রিপাক্ষিক পর্যায়েই সীমিত থাকে।
প্রশ্নটি তাই রয়ে যায়—পাকিস্তানের নতুন জোটের স্বপ্ন কি বাস্তব হবে?
আন্তর্জাতিক সংকট গোষ্ঠীর বিশ্লেষক প্রভীন ডোন্থি মনে করেন, SAARC-এর মৃত্যু দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন জোটের শূন্যতা তৈরি করেছে। বাংলাদেশের ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের উষ্ণতা এই ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতাকে এগিয়ে দিয়েছে।
তবে এটি বাস্তব রূপ পাবে কি না—তা নির্ভর করছে দুই বিষয়ের উপর: রাষ্ট্রগুলো কি এই ছোট জোটে বাস্তব লাভ দেখছে, এবং এতে যোগ দিলে ভারতের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি গ্রহণে তারা প্রস্তুত কি না।
শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপ, এমনকি ভুটানও প্রাথমিক আগ্রহ দেখাতে পারে বলে আখতার মনে করেন—বিশেষত সংযোগ, জলবায়ু সহনশীলতা ও অর্থনৈতিক স্থিতির মতো ক্ষেত্রে। তবে ভারতের সূক্ষ্ম সংবেদনশীলতা এই পথকে কঠিন করে তুলতে পারে।
যদি এই উদ্যোগ এগোয়, তাহলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেও নতুন দূরত্ব তৈরি হতে পারে, পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব আরও বেড়ে যেতে পারে।
তবু পাকিস্তান আশাবাদী। তারা মনে করে—চীনের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে নবায়িত যোগাযোগ ইসলামাবাদকে আবার আঞ্চলিক মঞ্চে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় ফেরার আত্মবিশ্বাস দিয়েছে।
এই আত্মবিশ্বাসই পাকিস্তানকে নতুন দক্ষিণ এশিয়া কল্পনা করতে উৎসাহ দিচ্ছে—একটি অঞ্চল যেখানে শক্তির কেন্দ্র বদলে যায়, পুরোনো জোট ভেঙে নতুন সেতুবন্ধন গড়ে ওঠে।
















