গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার দেড় মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও প্রতিদিন ৬০০ ট্রাক ত্রাণ প্রবেশের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে খুব কমই পূরণ হচ্ছে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে দাবি করছে বিপুল পরিমাণ খাদ্য, ওষুধ, তাবু ও জ্বালানি বহনকারী ট্রাক গাজায় ঢুকছে—সংখ্যা বলা হচ্ছে হাজারের ওপর। কিন্তু বাস্তবে গাজার মানুষের হাতে খুব কমই পৌঁছাচ্ছে এসব সহায়তা।
২৬ নভেম্বরের এক বিবৃতিতে ইসরায়েল দাবি করেছে, যুদ্ধবিরতির পর থেকে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৪২০০ ট্রাক ত্রাণ ঢুকেছে এবং কেবল খাদ্যবাহী ট্রাকই ১৬ হাজারের বেশি। এসব হিসাব শুনলে মনে হতে পারে, গাজার মানুষই যেন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি খাদ্য সহায়তা পাচ্ছে।
কিন্তু মানবিক সংস্থাগুলোর হিসাব সম্পূর্ণ আলাদা। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) বলছে, প্রয়োজনীয় খাদ্যের মাত্র অর্ধেক গাজায় প্রবেশ করছে। ফিলিস্তিনি ত্রাণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রকৃত প্রয়োজনের মাত্র এক-চতুর্থাংশ সহায়তা গাজায় ঢুকতে পারছে।
তারও মাত্র একটি ক্ষুদ্র অংশ সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছায়। কারণ সীমান্ত থেকে শরণ্যকেন্দ্র এবং আশ্রয় ক্যাম্পে পৌঁছানোর পথই গাজার ‘বারমুডা ত্রিভুজ’—যেখানে ত্রাণ যেন হারিয়ে যায়।
মানুষ প্রতিদিন ট্রাকের ছবি দেখে, ভিডিও দেখে। কিন্তু নিজেদের ক্যাম্পে পৌঁছাতে দেখে না কোনো ত্রাণ। ময়দার কথা শুনলেও রুটি পায় না, খাদ্যশস্য ঢুকলেও বাজারে ত্রাণের লেবেল লাগানো ক্যান ১৫ ডলারে বিক্রি হয়। অনেক সময় পরিবারের হাতে পৌঁছানো ত্রাণ-প্যাকেটও থাকে অসম্পূর্ণ—যেমন কেউ কেউ পেয়েছেন শুধু তেল, কিন্তু চাল বা ডাল নেই।
গাজার এই সংকট শুধু দুর্নীতির বিষয় নয়। দুই বছরের গণহত্যা ও যুদ্ধের ফলে সরকারি কাঠামো ভেঙে পড়েছে, প্রতিষ্ঠানগুলো পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস হয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই, নেই একক কর্তৃত্ব। স্থানীয় প্রভাবশালী পরিবার, সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং বিভিন্ন কমিটিই নিয়ন্ত্রণ করে ত্রাণবাহী গাড়ির চলাচল।
জাতিসংঘের তথ্য বলছে, ১৯ মে থেকে ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত ৮০৩৫টি ট্রাক গন্তব্যে পৌঁছালেও ৭১২৭টি ট্রাক “বাধাগ্রস্ত” হয়েছে—হয় জোর করে, নয়তো তথাকথিত শান্তিপূর্ণভাবে। ইসরায়েল সেনাবাহিনী ত্রাণবাহী গাড়িকে এমন রুট নিতে বাধ্য করে, যেখানে ঝুঁকি বেশি। অন্য রুটগুলো আবার স্থানীয় শক্তিধারী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে।
আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোও নিরাপত্তার কারণে ট্রাকের সঙ্গে থাকতেও পারে না, লাইভ পর্যবেক্ষণও করতে পারে না। ফলে পর্যবেক্ষণের ঘাটতি কাজে লাগাচ্ছে বিভিন্ন পক্ষ—বণিকরা মুনাফার জন্য, সশস্ত্র গোষ্ঠী অর্থের জন্য, আর দখলদার শক্তি রাজনৈতিক চাপের অস্ত্র হিসেবে ক্ষুধাকে ব্যবহারের জন্য।
সব মিলিয়ে গাজার জনগণের দুর্ভোগ আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে। যুদ্ধবিরতির পর আন্তর্জাতিক মনোযোগ কমে গেছে, সহায়তা কোথায় হারাচ্ছে সে প্রশ্নও কমে গেছে। অথচ এই ত্রাণ নিখোঁজ হওয়া কোনো স্বাভাবিক প্রভাব নয়, এটি পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করার এক পরিকল্পিত কৌশল।
বিশ্ব যখন চোখ বন্ধ করে আছে, তখন গাজার ‘বারমুডা ত্রিভুজে’ শুধু ট্রাকই হারিয়ে যাচ্ছে না—ফিলিস্তিনিদের টিকে থাকার শক্তিটুকুও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
















