জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর—বিদেশি সম্পৃক্ততা, সরকারি ব্যর্থতা ও রাজনৈতিক আশ্রয়ের অভিযোগ
বিডিআর হত্যাযজ্ঞ তদন্তে জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন জানিয়েছে, ঘটনাটি ছিল পরিকল্পিত; প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন তৎকালীন এমপি শেখ ফজলে নূর তাপস। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ দলগতভাবে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল এবং শেখ হাসিনার ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ছাড়া এমন হামলা সম্ভব নয়।
বিডিআর বিদ্রোহের নামে সংঘটিত বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ নিয়ে গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দিয়েছে। রোববার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় কমিশন প্রধান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ল ম ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে সদস্যরা এই প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০০৯ সালের বিডিআর হত্যাকাণ্ড কোনো আকস্মিক বিদ্রোহ নয়—এটি ছিল সুপরিকল্পিত একটি অভিযান। কমিশনের দাবি, এই ঘটনায় প্রধান সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেছেন তৎকালীন সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ দলগতভাবে জড়িত ছিল এবং ঘটনাস্থলে প্রবেশ–বহির্গমনসহ রক্ষায়ও সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে।

প্রধান উপদেষ্টা প্রতিবেদন গ্রহণ করে বলেন, দীর্ঘদিন জাতি অন্ধকারে ছিল—এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে বহু অজানা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে। “এটি জাতির জন্য মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকবে”—মন্তব্য করেন তিনি।
কমিশন প্রধান ফজলুর রহমান জানান, ১৬ বছর আগের ঘটনার বহু আলামত নষ্ট হয়ে গেলেও দীর্ঘ সাক্ষ্য, নথি ও পূর্ব তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ ও পেশাদার তদন্ত সম্পন্ন করা হয়েছে। “সাক্ষীরা অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলেছেন—আমরা কাউকে থামাইনি,” উল্লেখ করেন তিনি।
কমিশনের সদস্য অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার আরও বলেন, হত্যাকাণ্ডে বহিঃশক্তির সম্পৃক্ততার পাশাপাশি তৎকালীন সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে রাজনৈতিক ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ছিল বলেই এমন নৃশংসতা সম্ভব হয়েছে।
তার ভাষায়, “স্থানীয় আওয়ামী লীগ ২০–২৫ জনের একটি মিছিল নিয়ে পিলখানায় ঢুকে এবং বের হওয়ার সময় তা বেড়ে দাঁড়ায় দুই শতাধিক। হত্যাকারীদের রক্ষায় তারা সরাসরি ভূমিকা রেখেছে।”
তিনি আরও বলেন, দোষ নিরূপণে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী থেকে সেনাপ্রধান পর্যন্ত সবার দায়িত্ব রয়েছে। পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ‘চরম ব্যর্থতা’ ছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত কমিশন আরও জানিয়েছে, ঘটনার সময় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় যে বিডিআর সদস্যদের সঙ্গে শেখ হাসিনা বৈঠক করেছিলেন, তাদের পরিচয় ও তথ্য সংরক্ষণ না করাও তদন্ত প্রক্রিয়ায় বড় বাধা ছিল।
মিডিয়ার কিছু অংশকে দোষারোপ করে কমিশন বলেছে, কয়েকজন সাংবাদিক অপেশাদার আচরণে পরিস্থিতি আরও জটিল করেছিলেন।

প্রতিবেদনে ভবিষ্যতে সীমান্তরক্ষী বাহিনীসহ সব নিরাপত্তা সংস্থায় শৃঙ্খলা, সমন্বয় ও কমান্ড–কন্ট্রোল শক্তিশালী করতে একাধিক সুপারিশ করা হয়েছে।
বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আব্দুল হাফিজ এবং স্বরাষ্ট্র সচিব নাসিমুল গনি।
















