ঘূর্ণিঝড় দিতওয়ার অপ্রতিরোধ্য বর্ষণ ও বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে শ্রীলঙ্কা। মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩২ জনে, আর নিখোঁজ অন্তত ১৭৬ জন। দেশের নানা প্রান্তে হাজারো ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে আছে অসহায় মানুষের দীর্ঘশ্বাস।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র জানিয়েছে, প্রায় ১৫ হাজার বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে প্রচণ্ড বৃষ্টি ও বন্যায়। আশ্রয় হারানো প্রায় ৪৪ হাজার মানুষ এখন রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে পরিচালিত অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে দিন কাটাচ্ছেন।
মেঘের ভারী শরীর এখনও পুরোপুরি সরে যায়নি। ঘূর্ণিঝড়ের মূল অংশ ভারতের দিকে এগোলেও মধ্যাঞ্চলের ক্যান্ডি জেলায় আবারও ধসে পড়েছে ভূমি। রাজধানী কলম্বো থেকে প্রায় ১১৫ কিলোমিটার দূরের এই এলাকায় প্রধান সড়কের বিভিন্ন অংশ এখনো পানির নিচে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রের মহাপরিচালক সম্পথ කොටුවෙගොඩ জানিয়েছেন, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যরা ত্রাণকাজে যুক্ত হয়েছেন। তিনি বলেন, “সশস্ত্র বাহিনীর সহায়তায় উদ্ধার ও ত্রাণ অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে।”
শ্রীলঙ্কা রেডক্রসের মহাসচিব মাহেশ গুণাসেকারা জানান, বহু মানুষ এখনো বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকায় আটকে আছেন। উদ্ধারকর্মীরা পৌঁছাতে লড়াই করছে সময়ের সঙ্গে।
তিনি বলেন, “দুই দিনের পরও পানি বেড়েই চলেছে। ঘূর্ণিঝড় দূরে সরে গেলেও আমাদের দুর্ভোগ এখনো শেষ হয়নি।”
কলম্বো দিয়ে বয়ে যাওয়া কেলানি নদী শুক্রবার রাতে বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসে, ডুবে যায় আশেপাশের এলাকা। শত শত মানুষ রাতারাতি নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটে যেতে বাধ্য হন।
এদিকে দেশজুড়ে বিপর্যস্ত পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছে সরকার। বিদেশে থাকা শ্রীলঙ্কানদেরও আক্রান্ত প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী হারিনি আমারাসুরিয়া কলম্বোতে বিভিন্ন দূতাবাসের কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেছেন এবং সহযোগিতা চেয়েছেন।
ভারত দ্রুত সাড়া দিয়েছে। দেশটি দুইটি উড়োজাহাজ ভরে ত্রাণ পাঠিয়েছে। একই সঙ্গে কলম্বো বন্দরে থাকা একটি ভারতীয় যুদ্ধজাহাজও নিজেদের মজুত খাদ্যসহায়তা শ্রীলঙ্কাকে দিয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক মাধ্যমে শ্রীলঙ্কার প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলেছেন, প্রয়োজন হলে আরও সহায়তা পাঠাতে প্রস্তুত তারা।
শনিবার রাজধানীতে বৃষ্টি কিছুটা কমলেও দেশটির উত্তরাঞ্চলে এখনো ঝরছে দিতওয়ার লেজের ভারী ফোঁটা।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র আশঙ্কা করছে, এবারকার বন্যা ২০১৬ সালের তুলনাও ছাড়িয়ে যেতে পারে—যে বছর বন্যায় প্রাণহানি হয়েছিল ৭১ জনের।
চলতি বছরের এই দুর্যোগ দেশটিতে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ। গত বছর জুনে ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল ভারী বৃষ্টিতে, আর ডিসেম্বর মাসে বন্যা ও ভূমিধসে নিহত হয়েছিল ১৭ জন।
দিতওয়ার ধ্বংসস্তূপে আজ শ্রীলঙ্কার আকাশ ভারী, নদীর জল অশ্রুসজল, আর মানুষের হৃদয়ে জমে আছে দুঃসহ আঁধার।
















