মিশরের চলমান প্রতিনিধি পরিষদ নির্বাচন দেশের রাজনীতিতে এক গভীর উত্তাপ ছড়িয়ে দিয়েছে। এই নির্বাচন শুধু সংসদের ভবিষ্যৎ গঠনই নির্ধারণ করবে না, বরং প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ এল-সিসির ক্ষমতার মেয়াদ কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে তাও স্পষ্ট করে দেবে।
অর্থনৈতিক ধস, জনঅসন্তোষের ঢেউ আর রাজনৈতিক শ্বাসরুদ্ধ পরিবেশের মাঝেই এই ভোট আয়োজন করা হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে বহু বিশ্লেষক বলছেন, নির্বাচন নয়, বরং ক্ষমতা ধরে রাখার এক সুসংগঠিত প্রক্রিয়া চলছে দেশটিতে।
২০১৩ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় আসা এল-সিসি শুরু থেকেই কঠোর কর্তৃত্ববাদী শাসন কাঠামো গড়ে তোলেন। ২০১৯ সালে সংবিধান সংশোধনের নামে আয়োজিত গণভোটে অসংখ্য সমালোচনামূলক ওয়েবসাইট বন্ধ করা হয়, বিরোধী প্রচারণাকারীদের গ্রেপ্তার করা হয়, আর ভোটারদের ভয় দেখানো ও প্রলোভন দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ফলাফলও প্রত্যাশিত—বড় ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’ ভোটে তাঁর শাসন ২০৩০ সাল পর্যন্ত নিশ্চিত হয়।
এখন, ২০৩০ সালের হিসাবনিকাশের আর অল্প কিছু বাকি থাকতেই কথা উঠেছে আরও একটি মেয়াদ বাড়ানোর। ধারণা করা হচ্ছে, নতুন প্রতিনিধি পরিষদকে ব্যবহার করে আবারো সংবিধান পরিবর্তনের পথে হাঁটতে পারেন এল-সিসি।
মিশরের দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদের মধ্যে প্রতিনিধি পরিষদই সবচেয়ে শক্তিধর। মোট ৫৯৬ আসনের এই কক্ষের আইন প্রণয়ন ও সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু এই কক্ষের সদস্যরা প্রকৃত অর্থে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন না—এমন অভিযোগ পুরোনোই বটে।
৫৯৬ আসনের মধ্যে ২৮ জনকে সরাসরি নিয়োগ দেন প্রেসিডেন্ট। বাকি আসনগুলো ব্যক্তিগত ও দলীয় তালিকার ভিত্তিতে ভাগ করা হলেও পরিস্থিতি এমনভাবে সাজানো থাকে যে, ক্ষমতাস্বর্থীদের জন্যই পথ খোলা।
দলীয় তালিকার ক্ষেত্রে ‘অ্যাবসলুট ক্লোজড-লিস্ট’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, যেখানে কোনো তালিকা ৫০ শতাংশ ভোট পেলেই পুরো আসন পেয়ে যায়। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অনুমতি শুধুমাত্র অনুমোদিত তালিকাগুলোকেই দেওয়া হয়।
এই নির্বাচনে তো প্রতিযোগিতার ন্যূনতম ছায়াটুকুও উধাও। জাতীয় নির্বাচন কমিশন প্রায় সব দলীয় তালিকাকেই বাতিল করে দিয়েছে, টিকে আছে শুধু একটি—এল-সিসির ন্যাশনাল লিস্ট ফর ইজিপ্ট। অভিযোগ উঠেছে, এই তালিকায় জায়গা পাওয়ার জন্য কয়েক কোটি মিশরীয় পাউন্ড পর্যন্ত ঘুষ দাবি করা হয়েছে।
নভেম্বরের ১০ ও ১১ তারিখে প্রথম দফা ভোটে ভোটকেন্দ্রের সামনে অনিয়ম, অবৈধ প্রচারণা, প্রকাশ্য টাকা ছড়ানো—সবকিছুর ভিডিও প্রকাশ্যে এসেছে। এমনকি কিছু আসনের নির্বাচন বাতিল করে পুনর্নির্ধারণ করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।
দ্বিতীয় দফার ভোটেও সেই অনিয়মের ধারা থামেনি। সরকারপন্থী গণমাধ্যম সারাক্ষণ ‘শৃঙ্খলা’, ‘উচ্চ ভোটার উপস্থিতি’ আর ‘সুশৃঙ্খল পরিচালনা’র গল্প প্রচার করেছে, অথচ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে শূন্য ভোটকেন্দ্র ও বিশৃঙ্খলার দৃশ্য।
ফল ঘোষণা হবে আগামী মাসে, তবে ফলাফল নিয়ে কোনো উত্তেজনা নেই—সবাই জানে এল-সিসির জোটই সংসদ দখল করবে, যেমনটি তারা সিনেটেও করেছে।
এল-সিসি এমন এক দমন-পীড়নের রাষ্ট্রযন্ত্র তৈরি করেছেন, যা মিশরের ইতিহাসে নজিরবিহীন—বিরোধীদের কারাবাস, মিডিয়া নিষেধাজ্ঞা, দল নিষিদ্ধকরণ, কঠোর আইন—সব মিলিয়ে এক ভয়ংকর আবহ। ক্ষমতা ছাড়ার ভাবনাটুকু তাঁর কাছে আত্মঘাতী মনে হয়, কারণ সে মুহূর্ত থেকেই শুরু হতে পারে জবাবদিহি এবং অভ্যন্তরীণ প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রতিশোধ।
পার্লামেন্ট নির্বাচন শেষে এল-সিসি নিশ্চিন্তে আরও ছয় বছরের মেয়াদ চাইতে পারবেন—এই সময়টি তাঁকে আরেকটু শ্বাস নেওয়ার সুযোগ দেবে। কিন্তু প্রান্তে দাঁড়িয়ে জমছে ক্ষোভ—অর্থনীতির পতন, দুর্নীতি, এককেন্দ্রিক শাসন মিলিয়ে মানুষের ধৈর্য ফুরিয়ে আসছে।
ইতিহাস বলছে, প্রায় একই ভুল করেছিলেন হোসনি মোবারকও। তিনিও ভাবতেন সব ঠিক আছে—যতক্ষণ না সেই শাসন ভেঙে পড়ে।
একনায়কতন্ত্রের মুঠি যত শক্ত হয়, ততই কখনো কখনো ক্ষমতা আঙুলের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যায়—আর সেই সময় কত দূরে, তা হয়তো মিশর নিজেরাই ঠিক করবে।
















