মিরপুরের বিকেলের আলো আজ যেন অন্য রকম ঝলমলে। মাঠের প্রতিটি ঘাসের ডগায় টের পাওয়া যায় বাংলাদেশের উচ্ছ্বাস, গর্ব আর অর্জনের সুবাস। তাইজুল ইসলাম যখন রেকর্ডব্রেকিং সেই উইকেটটি তুলে নিলেন, মুশফিক ছুটে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরলেন—যেন দীর্ঘ দিনের পরিশ্রম, পরিশ্রুত ঘাম আর সংগ্রামের এক আবেগময় উৎসব। সতীর্থরা ঘিরে ধরল দুজনকে, হাসিতে ভরে উঠল মুখ। এ যেন শুধু একটি মুহূর্ত নয়, পুরো টেস্ট ম্যাচের প্রতীক হয়ে থাকা বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস।
এই দ্বিতীয় টেস্টে কে কত দূর পৌঁছালেন, কোন মাইলফলকের সোনালি দরজায় কে প্রথম নক করলেন—এ নিয়েই ছিল আলোচনার মূল সুর। নিজের শততম টেস্টে মুশফিকুর রহিম এক ইনিংসে সেঞ্চুরি, অন্য ইনিংসে ফিফটি করে লিখেছেন নতুন গল্প। লিটন দাসও তুলে নিয়েছেন দুর্দান্ত সেঞ্চুরি। আর সাকিবকে টপকে দেশের সর্বোচ্চ টেস্ট উইকেটশিকারির আসন এখন তাইজুল ইসলামের দখলে—বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে আরেক নতুন অধ্যায় যোগ হলো আজ।
ম্যাচের ফল? দুই দিন আগেই যেন নির্ধারিত। দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশ ২১১ রানের লিড নিয়েই যখন আবার ব্যাট করতে নামে, তখনই বোঝা যায় আয়ারল্যান্ডের সামনে বিশাল এক পাহাড় দাঁড়িয়ে গেছে। এখন শেষ দিনে আইরিশদের করতে হবে ৩৩৩ রান, হাতে আছে মাত্র ৪ উইকেট। অলৌকিক কিছু না ঘটলে বাংলাদেশ জয় থেকে একদম হাতের নাগালে।
চতুর্থ দিনের শুরুতে বাংলাদেশের লিড ছিল ৩৬৭। মিরপুরে চতুর্থ ইনিংসে এমন লক্ষ্য তাড়া করা প্রায় অসম্ভবেরই কাছাকাছি। দিন শুরুতেই সাদমানের ৭৮ রানে আউট হওয়া আর একটু পর অধিনায়ক নাজমুলের বিদায়—কিছুটা চাপের মুহূর্ত তৈরি করে। সাদমান সিলেটে করেছিলেন ৮০, এখানে করলেন ৭৮—দুবারই সেঞ্চুরির হাতছানি ফিরিয়ে নিয়ে দিল ভাগ্য।
এরপর মুমিনুল হক শুরু করলেন নিজের সোনালি ইনিংস। অর্ধশতক পার করেই এগিয়ে গেলেন সেঞ্চুরির পথে। পাশে তখন অপরাজিত মুশফিক। কিন্তু লাঞ্চের পরই গ্যাভিন হোয়ের বলে মুমিনুলের বিদায় ঘটে ৮৭ রানে। আর তখনই ইনিংস ঘোষণা করলেন নাজমুল। মুশফিক তখনো ৫৩ রানে অপরাজিত—তবে একই টেস্টে দুই ইনিংসেই ফিফটি করার বিরল কীর্তি গড়ে ফেলেছেন তিনি। আগে শুধু রিকি পন্টিং এমনটি করতে পেরেছিলেন নিজের শততম টেস্টে।
৫০৯ রানের বিশাল লক্ষ্য সামনে রেখে ব্যাট করতে নেমে আয়ারল্যান্ডের শুরুই হলো বিপর্যয়ের। ২৩ রানে তাইজুল এলবিডব্লু করে ফিরিয়ে দেন অধিনায়ক বলবার্নিকে। ঐ উইকেটেই তিনি সাকিবকে পেছনে ফেলে দেশের সর্বোচ্চ টেস্ট উইকেটশিকারি হয়ে গেলেন। ইতিহাসের পাতায় নতুন নাম—তাইজুল ইসলাম।
আয়ারল্যান্ডের ছয় উইকেটের মধ্যে পাঁচটিই আজ তুলেছেন দুই বাঁহাতি স্পিনার—তাইজুল ও হাসান মুরাদ। বাকি উইকেট পেয়েছেন খালেদ আহমেদ। হ্যারি টেক্টরের ফিফটি ছাড়া আইরিশদের তেমন কোনো প্রাপ্তি নেই।
এখন শেষ দিনের অপেক্ষা—কতক্ষণ লড়াই ধরে রাখতে পারবে কার্টিস ক্যাম্পার ও অ্যান্ডি ম্যাকব্রাইন? নাকি হঠাৎ কোনো অসম্ভবকে সম্ভব করে ফেলবে আয়ারল্যান্ড? তবে ম্যাচের চিত্র বলছে—বাংলাদেশের জয় যেন দরজায় কড়া নাড়ছে, কেবল সময়ের অপেক্ষা।
















