কেনিয়ার থিকা শহরের দর্জির দোকান চালানো মেরি মাংগি ছোটবেলায় শখ করে বোনা কাজ শিখেছিলেন। কিন্তু ২০১৭ সালে মেরুদণ্ডে ক্যান্সার ধরা পড়ে দীর্ঘ ১১ মাস শয্যাশায়ী থাকার সময় তিনি আবার সেই বোনা কাজে ফিরে আসেন। প্রথমে তিনি টুপি বানিয়ে নাইরোবির কেনিয়াটা ন্যাশনাল হাসপাতালের ক্যান্সার রোগীদের দান করতেন।
পরের বছরই তাঁর জীবনে আসে আরও বড় ধাক্কা—স্টেজ–থ্রি স্তন ক্যান্সার ধরা পড়ে। ৫২ বছর বয়সী তিন সন্তানের এই মা বলেন, খবর শোনার পর তিনি ভয় ও হতাশায় নিজেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নেন। পরিবার–বন্ধুবান্ধবের সঙ্গও এড়িয়ে যান। পরে তাঁর একটি স্তন অপসারণ, রেডিওথেরাপি এবং দীর্ঘ চার বছরের চিকিৎসায় নেমে আসে আর্থিক বিপর্যয়ও—দর্জি ব্যবসা বাড়ানোর জন্য নেওয়া ১০ হাজার ডলারের ঋণও শেষ হয়ে যায় চিকিৎসার খরচে।
শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি ছিল সামাজিক অপবাদ। নিজের সম্প্রদায়ে তাঁকে ডাকা হতো “যার স্তন কেটে ফেলা হয়েছে” বলে। এতে মানসিক আঘাত আরও বাড়ত।
হাসপাতালের ক্যান্সার ওয়ার্ডে অন্য নারীদের বড় ওড়না বা ঢিলেঢালা কাপড়ে অপারেশনের দাগ ঢাকতে দেখে তিনি বুঝতে পারেন—অনেকেরই একই অভিজ্ঞতা। সাশ্রয়ী দামে প্রোস্থেটিক স্তন পাওয়া না-যাওয়ায় তাঁদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
এই অভিজ্ঞতা থেকেই মেরি ভাবেন—যে বোনা কাজ তাঁকে মানসিক শক্তি দিয়েছে, সেই দিয়েই অন্যদের সাহায্য করা যায় কি না। তিনি রঙিন সুতায় হাতে বোনা স্তন প্রোস্থেটিক বানানো শুরু করেন, যা বিশেষ নকশার ব্রার ভেতরে পরা যায়।
একটি বোনা প্রোস্থেটিকের দাম তিনি রাখেন ১,৫০০ কেনিয়ান শিলিং (প্রায় ১১.৬০ ডলার)। যেখানে সিলিকন প্রোস্থেটিকের দাম ২২ হাজার শিলিং—যা অধিকাংশ নারীর নাগালের বাইরে, কারণ দেশটির প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ দিনে ৩ ডলারের কম আয়ে বেঁচে থাকেন।
মেরি এখন প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৫০টি বোনা প্রোস্থেটিক তৈরি করেন। এরই মধ্যে তিনি প্রায় ৬০০ প্রোস্থেটিক এবং ৪৫০টির বেশি বোনা টুপি বিক্রি করেছেন। তাঁর পণ্যবাহী অর্ডার নেয় মাইলেল হেলথ, কেনিয়াটা ন্যাশনাল হাসপাতাল ও চাইল্ডহুড ক্যান্সার ইনিশিয়েটিভের মতো সংস্থাগুলো—যারা পরে সেগুলো রোগীদের দান করে। এতে তাঁর জীবিকা যেমন ফিরে এসেছে, তেমনি চিকিৎসা-পরবর্তী সময়ে সহায়তাবঞ্চিত নারীদেরও উপকার হচ্ছে।
তিনি “নিউ ডন ক্যান্সার ওয়ারিয়র্স” নামের এক সাপোর্ট গ্রুপও পরিচালনা করেন, যেখানে রোগীরা নিজেদের গল্প ভাগ করে নেন। মেরির দেখানো সহায়তায় ‘জেন’ নামে ৩৩ বছর বয়সী এক নারী মাসটেকটমির পর হারানো আত্মবিশ্বাস ধীরে ধীরে ফিরে পান, এবং এখন তিনি নিয়মিত গ্রুপের আলোচনায় অংশ নেন।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, বোনা প্রোস্থেটিক শুধু সাশ্রয়ী নয়—এটি নারীদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতেও সাহায্য করে।
মেরি এখন নিজের দোকানে অনানুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বোনা কাজ শেখাচ্ছেন। জানুয়ারির পর থেকে ইতোমধ্যে ২০০–র বেশি নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনি। তাঁদের একজন—হান্না মুগো, যিনি নিজেও ক্যান্সারজয়ী। এখন তিনি প্রতি সপ্তাহে সাতটি প্রোস্থেটিক তৈরি করে মেরির দোকানে জমা দেন, যা তাঁর পরিবারের আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
এ প্রশিক্ষণে শুধু ক্যান্সারজয়ীরাই নয়—লিভার ট্রান্সপ্লান্ট–সহ দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা জয় করা নারীরাও অংশ নিচ্ছেন। তাঁদের কাছে এটি আয়ের পাশাপাশি মানসিক পুনর্গঠনের পথ।
যদিও জায়গা ও অর্থের সীমাবদ্ধতায় একসঙ্গে চারজনের বেশি প্রশিক্ষণ দিতে পারেন না মেরি, তবু তাঁর লক্ষ্য দেশের যত বেশি ক্যান্সারজয়ী নারীকে সম্ভব স্বাধীন উপার্জনের পথ দেখানো।
মেরি বলেন, “বোনা কাজ শুধু আমাকে বাঁচায়নি, আমার জীবনের উদ্দেশ্যও বদলে দিয়েছে। এখন চাই—অনেক নারী যেন এই কাজের মাধ্যমে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে।”
















