জাফফরপুর জেলার বিশ বছর বয়সী অজয় কুমার সকালে ঘুম থেকে উঠে মোবাইলে খবর স্ক্রল করছিলেন। হঠাৎই দেখলেন, যে সরকারি চাকরির পরীক্ষার জন্য তিনি মাসের পর মাস প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, সেই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে।
অজয় দলিত সম্প্রদায়ের একজন সদস্য – ভারতের সবচেয়ে নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। জীবনের দারিদ্র্য, বঞ্চনা, অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তির পথ হিসেবে তিনি দেখেছিলেন এই চাকরিটিকে। কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ভেঙে পড়েছিল তার সব স্বপ্ন।
ঠিক তখনই তিনি সামাজিক মাধ্যমে দেখলেন, তার মতো হাজারো তরুণ পাটনায় রাস্তায় নেমেছে প্রতিবাদে। রাতের বাসে চেপে তিনিও পাড়ি দিলেন রাজধানীর পথে। পরদিন সকালেই তিনি হয়ে গেলেন সেই তরুণ ঢেউয়ের অংশ – যাদের কণ্ঠে কেবল এক দাবি, “পুনঃপরীক্ষা চাই।”
টানা একশ দিন, কনকনে শীতে, খোলা আকাশের নিচে কাটিয়েছেন অজয় ও তার সহযোদ্ধারা। কিন্তু আদালতের সিদ্ধান্ত তাদের স্বপ্ন ভেঙে দেয় – পুনঃপরীক্ষা হবে না। ভোটের দিন, নভেম্বরের ছয় তারিখে, ভোট মেশিনের বোতামে চাপ দিয়ে যেন নিজের ক্ষোভ, অভিমান, হতাশা উজাড় করে দিলেন অজয়।
বিহারের তরুণেরা: আশার মুখে রাগের ছায়া
দক্ষিণ এশিয়ার নানা দেশে তরুণ আন্দোলনে সরকার পতনের ঢেউ উঠেছে, কিন্তু ভারত এখনো সেই ঝড়ের বাইরে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে দেশ শাসন করছে বিজেপি, আর বিহারে গত দুই দশকের বেশিরভাগ সময় ক্ষমতায় রয়েছেন নীতীশ কুমার।
তবু বিহারে তরুণদের রোষ এখন আর লুকিয়ে নেই। ১২ কোটি ৮০ লাখ মানুষের এই রাজ্যে ৪০ শতাংশই ১৮ বছরের নিচে, আর ২৩ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ২৯ এর মধ্যে। ভারতের সবচেয়ে তরুণ রাজ্য, অথচ সবচেয়ে দরিদ্রও।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, প্রতি তিনটি বিহারি পরিবারের একটি চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করে। শিক্ষাব্যবস্থা নড়বড়ে, কর্মসংস্থানের অভাব চরমে। জাতীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ছাত্র আন্দোলনের সংখ্যায় বিহার ছিল শীর্ষে – মোট ৪০০টি আন্দোলন।
এবারের নির্বাচনে তাই তরুণরাই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। নভেম্বরের ৬ ও ১১ তারিখে দুই দফায় ভোটগ্রহণ শেষে ১৪ নভেম্বর গণনা হবে এই নির্বাচন। ২৪৩ আসনের বিধানসভায় কে গড়বে সরকার – সেটিই এখন দেশের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।
রাগের শিকড়: শিক্ষা ও কর্মহীনতা
দক্ষিণ বিহারের জেহানাবাদ জেলার ছাত্র প্রথম কুমার বলেন, “নিজ শহরের কলেজে পড়াশোনা হয় না, শুধু ডিগ্রি বিক্রি হয়। তাই বাধ্য হয়ে পাটনায় চলে এসেছি।”
কিন্তু পাটনাতেও পড়াশোনা সহজ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে নেই বিশুদ্ধ পানি, ওয়াই-ফাই মাসের পর মাস অচল, আর ছাত্রদেরই ঘাস কেটে লন পরিষ্কার করতে হয়।
“সরকারি কলেজে ভর্তি মানে শুধু নাম, আসল শিক্ষা পেতে হলে কোচিং ক্লাসে যেতে হয় টাকাপয়সা খরচ করে,” ক্ষোভ ঝরল তার কণ্ঠে।
প্রথমের বন্ধু ইশান্ত কুমার বলেন, “দারিদ্র্য আমাদের বাইরে ঠেলে দেয়। কলকাতা থেকে মহারাষ্ট্র পর্যন্ত, যেখানে যাই, আমরা ‘বিহারি’ বলে হেনস্তা হই। আমাদের পরিশ্রমে অন্য রাজ্য এগোয়, অথচ নিজের ঘরে উন্নয়নের আলো জ্বলে না।”
এদিকে বৈশালী জেলার ২৩ বছরের কমল কুমারীর ক্ষোভ আরও তীব্র। রাজনৈতিক বিজ্ঞানে স্নাতক হওয়ার পরও সরকারি প্রতিশ্রুত ৫০ হাজার টাকার অনুদান তিনি পাননি দুই বছরেও। ওই টাকায় তিনি শিক্ষকতা কোর্সে ভর্তি হতে চেয়েছিলেন, এখন সেটা স্বপ্নই রয়ে গেছে।
“আমি পড়াশোনায় এত টাকা খরচ করেছি শুধু সরকারের প্রতিশ্রুতির ভরসায়। এখন দুই বছর নষ্ট হলো শুধু অপেক্ষায়,” চোখ ভেজা কণ্ঠে বললেন তিনি।
যুবসমাজের ক্ষোভ, রাজনীতির জ্বালানি
পাটনার জনপ্রিয় কোচিং শিক্ষক রামানশু মিশ্র বলেন, “ছাত্ররা সবসময় রাগে থাকে – পড়াশোনায় হতাশ, চাকরিতে আশাহীন।” সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বিহারের শহরাঞ্চলে ১৫-২৯ বছর বয়সীদের বেকারত্বের হার ২২ শতাংশ – জাতীয় গড়ের চেয়ে অনেক বেশি।
এই তরুণ ক্ষোভই এখন পরীক্ষার ময়দান হয়ে উঠেছে প্রধানমন্ত্রী মোদি ও বিরোধী জোটের জন্য। বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারের মুখ নীতীশ কুমার, আর প্রতিদ্বন্দ্বী জোট ইন্ডিয়া অ্যালায়েন্সের মুখ তরুণ নেতা তেজস্বী যাদব।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে বিজেপি বলেছে, ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবে তারা। অন্যদিকে ইন্ডিয়া জোটের অঙ্গীকার, “প্রতিটি পরিবারে একটি করে সরকারি চাকরি, ক্ষমতায় আসার ২০ দিনের মধ্যে।”
মোদির ভাষণে প্রতিশ্রুতি শোনা গেছে ডিজিটাল যুগেরও – “আজ এক কাপ চায়ের দামে ১ জিবি ডেটা পাওয়া যায়,” তিনি বলেছেন, “এটাই নতুন প্রজন্মের জন্য আমার উপহার।”
কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিলাঞ্জন মুখোপাধ্যায় মনে করেন, এই ভোটের ফলাফলই দেখাবে ভারতের তরুণেরা কী চান – “তারা কি পুরোনো নেতৃত্বকে ধরে রাখবে, নাকি নতুন প্রজন্মের হাতে ক্ষমতা তুলে দেবে?”
বিহারের তরুণদের চোখে এখন যে প্রশ্ন জ্বলছে, তা শুধু রাজ্যের নয় – সমগ্র ভারতের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। ভোটের ফলাফলে তারা কি আশার আলো দেখতে পাবে, নাকি আবারও হতাশার অন্ধকারে হারিয়ে যাবে?
















