আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
বিজ্ঞানীরা মানব ত্বকের কোষ ব্যবহার করে এমন ডিম্বাণু তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন, যা পরীক্ষাগারে নিষিক্ত হয়ে প্রাথমিক ভ্রূণ তৈরি করতে পারে। এই যুগান্তকারী সাফল্য বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন।
ন্যাচার কমিউনিকেশনস সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, গবেষকরা সাধারণ মানব ত্বক কোষের নিউক্লিয়াস (যেখানে জিনগত তথ্য থাকে) নিয়ে একটি দাতা ডিম্বাণুতে প্রতিস্থাপন করেন, যার নিজস্ব নিউক্লিয়াস অপসারণ করা হয়েছিল। এই প্রক্রিয়ায় তাঁরা ৮২টি কার্যকর মানব ওসাইট বা অপরিণত ডিম্বাণু তৈরি করেন, যা পরে পরীক্ষাগারে নিষিক্ত করা হয়।
ফলাফল ছিল এমন ডিম্বাণু, যা ত্বক কোষ দানকারীর ডিএনএ বহন করে এবং অন্য ব্যক্তির শুক্রাণুর সঙ্গে মিলিত হয়ে ভ্রূণ গঠনে সক্ষম হয়। এটি বন্ধ্যাত্ব চিকিৎসায় এক ঐতিহাসিক অগ্রগতি, যদিও চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য এটি চালু হতে আরও অন্তত এক দশক সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন হেলথ অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটির (OHSU) স্ত্রীরোগবিদ্যা ও প্রসূতিবিদ্যার অধ্যাপক ড. পাউলা অ্যামাটো।

অ্যামাটো বলেন, “এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বয়স্ক নারী, ক্যানসার চিকিৎসার কারণে ডিম্বাণু হারানো নারী কিংবা একই লিঙ্গের দম্পতিরাও (যেমন দুজন পুরুষ) জেনেটিকভাবে সম্পর্কিত সন্তান পেতে পারেন।”
প্রধান চ্যালেঞ্জ
সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল ডিম্বাণুর ক্রোমোজোম সংখ্যা ঠিক রাখা। স্বাভাবিকভাবে শুক্রাণু ও ডিম্বাণুতে থাকে ২৩টি করে ক্রোমোজোম, কিন্তু সাধারণ মানব কোষে থাকে ৪৬টি। গবেষক দলটি একে ‘মাইটো-মাইওসিস’ নামে নতুন একটি পদ্ধতিতে সমাধান করার চেষ্টা করে, যেখানে অতিরিক্ত ক্রোমোজোম অপসারণ করা হয়।
তবে চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। তৈরি হওয়া ডিম্বাণুর মধ্যে ৯ শতাংশেরও কম ভ্রূণ হয়ে ব্লাস্টোসিস্ট ধাপে পৌঁছাতে পেরেছে। আরও বড় সমস্যা হলো—সব ভ্রূণই ক্রোমোজোমগতভাবে অস্বাভাবিক ছিল, অর্থাৎ এদের থেকে স্বাস্থ্যকর শিশু জন্মানো সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞদের সতর্ক আশাবাদ
গবেষণার সহলেখক শৌখরাত মিতালিপভ, যিনি ১৯৯৭ সালে ভেড়া ডলি ক্লোনের প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিলেন, বলেছেন, “এটি এখন কেবল প্রমাণস্বরূপ গবেষণা। কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসায় ব্যবহার করা যাবে না।”
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউসিএলএ) বিশেষজ্ঞ অ্যামান্ডার ক্লার্কও বলেছেন, “বর্তমান অবস্থায় প্রযুক্তিটি ব্যবহারযোগ্য নয়, কারণ সব ভ্রূণই জেনেটিকভাবে অস্বাভাবিক। তবে এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ শুরু।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোটি কোটি নারী প্রজনন সমস্যায় ভোগেন যেখানে প্রচলিত আইভিএফ (IVF) সীমিত সাফল্য দেখায়। এই প্রযুক্তি একদিন হয়তো তাঁদের জন্য রূপান্তরমূলক সমাধান হয়ে উঠতে পারে।
ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা
এই গবেষণা মানুষ ক্লোনিং নয়, বরং এমন ভ্রূণ তৈরি করেছে যেখানে উভয় অভিভাবকের ক্রোমোজোম ছিল। তবে যেহেতু এতে সোমাটিক সেল নিউক্লিয়ার ট্রান্সফার ব্যবহৃত হয়েছে, তাই নৈতিক ও আইনগত বাধা কাটাতে আরও অনেক সময় লাগবে।
যুক্তরাজ্যের সাউথ্যাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রজনন বিশেষজ্ঞ ইয়িং চেয়ং মন্তব্য করেছেন, “এটি এখনো প্রাথমিক গবেষণা হলেও ভবিষ্যতে বন্ধ্যাত্ব, গর্ভপাত কিংবা ডিম্বাণু-শুক্রাণু না থাকা দম্পতিদের জন্য আশার আলো দেখাতে পারে।”
















