পাকিস্তানের রাজনৈতিক আকাশে আবারও ঘনিয়ে উঠছে বিতর্কের মেঘ। দেশটির সরকার ২৭তম সংবিধান সংশোধনী বিল পেশ করেছে, যা কেবল আইনগত পরিবর্তন নয়, সামরিক শক্তির ভারসাম্যেও আনতে পারে এক গভীর রদবদল। রবিবার ইসলামাবাদে জাতীয় পরিষদ ও সিনেটের আইন ও ন্যায়বিচার কমিটিতে বিলটি নিয়ে আলোচনায় উত্তপ্ত হয় পরিবেশ।
এই সংশোধনী বিলে প্রস্তাব করা হয়েছে নতুন এক সাংবিধানিক আদালত গঠনের পাশাপাশি উচ্চ আদালতের বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন। তবে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো সামরিক কাঠামোয় প্রস্তাবিত বড় ধরনের পরিবর্তন—যেখানে সেনাপ্রধানকে দেওয়া হতে পারে সর্বময় ক্ষমতা।
পাকিস্তানের সংবিধানের ২৪৩ অনুচ্ছেদে পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত এই অনুচ্ছেদে বলা আছে, সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ ফেডারেল সরকারের হাতে এবং সর্বোচ্চ কমান্ড প্রেসিডেন্টের হাতে ন্যস্ত থাকবে। নতুন প্রস্তাবে ‘চেয়ারম্যান জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটি’ পদটি বিলুপ্ত করে ‘চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস’ নামের নতুন একটি পদ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে।
এই পরিবর্তনের ফলে বর্তমান সেনাপ্রধানই হয়ে উঠবেন সমগ্র সামরিক বাহিনীর প্রধান। অর্থাৎ, সেনা, নৌ ও বিমান—তিন বাহিনীর একক নেতৃত্ব থাকবে তার হাতে। পাকিস্তানের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য ডন জানিয়েছে, চার দশক ধরে চেয়ারম্যান জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটি মূলত প্রতীকী পদ হিসেবেই থেকে এসেছে, যার কাজ ছিল তিন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় রক্ষা।
কিন্তু নতুন বিল পাস হলে ২৭ নভেম্বরের মধ্যেই এই পদ বিলুপ্ত হবে। একই সময়ে এই পদে থাকা জেনারেল শের শামশাদ মির্জা অবসরে যাচ্ছেন। ফলে চিফ অব আর্মি স্টাফ আসিম মুনীরই স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়ে উঠবেন চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস—অর্থাৎ, দেশের সামরিক কাঠামোর সর্বময় কর্তৃত্ব তার হাতে থাকবে।
বিলটির সমালোচকরা একে সেনাবাহিনীর ভেতর প্রতিষ্ঠানিক ভারসাম্য ধ্বংসের ইঙ্গিত বলে মনে করছেন। অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আসিফ ইয়াসিন মালিক সতর্ক করে বলেছেন, “একজন সেনা কর্মকর্তার হাতে নৌ ও বিমান বাহিনীর ওপর কর্তৃত্ব দেওয়া প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য নষ্ট করবে এবং বিপর্যয় ডেকে আনবে।” তার মতে, “এটি দেশের প্রতিরক্ষা শক্তি বৃদ্ধির জন্য নয়, বরং নির্দিষ্ট একজন ব্যক্তিকে সুবিধা দিতে প্রণীত।”
বিলে আরও বলা হয়েছে, চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেসের সুপারিশে প্রধানমন্ত্রী ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক কমান্ড’-এর কমান্ডার নিয়োগ দেবেন। এই কমান্ডার দেশের পারমাণবিক ও কৌশলগত সম্পদ তত্ত্বাবধান করবেন।
তাছাড়া ফিল্ড মার্শাল, মার্শাল অফ দ্য এয়ার ফোর্স ও অ্যাডমিরাল অফ দ্য ফ্লিট—এই পাঁচ তারকা পদধারী কর্মকর্তারা ‘জাতীয় বীর’-এর মর্যাদা পাবেন। তাদের আজীবন সুবিধা নিশ্চিত থাকবে এবং তারা প্রেসিডেন্টের মতোই ফৌজদারি মামলা থেকে অব্যাহতি পাবেন। শুধুমাত্র পার্লামেন্টে অভিশংসনের মাধ্যমে তাদের অপসারণ করা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে বিচারব্যবস্থায়ও আসছে পরিবর্তন। প্রস্তাবিত বিলে বলা হয়েছে, ‘ফেডারেল কনস্টিটিউশনাল কোর্ট’ নামে একটি নতুন আদালত গঠিত হবে, যেখানে প্রতিটি প্রদেশ থেকে সমান প্রতিনিধিত্ব থাকবে। বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা স্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকবে। বিচারপতিদের মেয়াদ ও সংখ্যা নিয়েও প্রেসিডেন্টের আদেশের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় তুলেছে এই সংশোধনী বিল। কেউ দেখছেন সামরিক শক্তির পুনর্গঠন, কেউ বা বলছেন এটি গণতন্ত্রের জন্য এক অশনিসংকেত। আর সাধারণ মানুষ—তারা তাকিয়ে আছে ইসলামাবাদের আকাশের দিকে, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত যেন লেখে পাকিস্তানের ভবিষ্যতের নতুন অধ্যায়।















