রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ যেন আগুনে ঘি ঢালছে প্রতিদিন। এবার ইউক্রেনের পাল্টা আঘাতে রাশিয়ার দুইটি শহর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছে। সীমান্তঘেঁষা বেলগোরোদ ও দূরের ভোরোনেজে ইউক্রেনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বিদ্যুৎ ও গরমের সরবরাহ ছিন্ন হয়ে পড়ে রবিবার।
বেলগোরোদ অঞ্চলের গভর্নর ভায়াচেসলাভ গ্লাদকভ জানান, ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে শহরের জ্বালানি অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে প্রায় ২০ হাজার পরিবার বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহ হারিয়েছে।
ভোরোনেজের গভর্নর আলেকজান্ডার গুসেভ জানান, একাধিক ইউক্রেনীয় ড্রোনকে ইলেকট্রনিকভাবে নিস্ক্রিয় করা হলেও একটি ইউটিলিটি স্থাপনায় আগুন ধরে যায়। শহরটির জনসংখ্যা এক মিলিয়নেরও বেশি।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, রাতে তারা ৪৪টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ধ্বংস বা আটক করেছে। তবে বেলগোরোদ বা ভোরোনেজের ঘটনা সেখানে উল্লেখ করা হয়নি।
একই সময় রোস্তভ অঞ্চলের তাগানরগ শহরেও বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দেয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, কাছের একটি ট্রান্সফরমার স্টেশনে আগুন লাগার কারণেই জরুরি বিদ্যুৎ বন্ধের ঘটনা ঘটে।
অন্যদিকে ইউক্রেনও রাশিয়ার ভয়াবহ বিমান হামলার শিকার হয়। দেশটির কর্মকর্তারা জানান, রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুইটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সরবরাহব্যবস্থা টার্গেট করা হয়, এতে সাতজন নিহত হন।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তারা “উচ্চ-নির্ভুল দীর্ঘ-পাল্লার অস্ত্র” ব্যবহার করে ইউক্রেনের অস্ত্র কারখানা ও জ্বালানি স্থাপনায় “বৃহৎ আঘাত” হেনেছে, যা ইউক্রেনের আগের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে চালানো হয়।
খারকিভ অঞ্চলে প্রায় এক লাখ মানুষ এখনো বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সংস্থা সেন্টরএনারগো জানায়, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এটি ছিল তাদের ওপর সবচেয়ে বড় আক্রমণ, যার ফলে কিয়েভ ও খারকিভের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
রাশিয়া এক রাতেই ৬৯টি ড্রোন ছুড়েছিল বলে দাবি করেছে ইউক্রেনের বিমানবাহিনী, যার মধ্যে ৩৪টি ধ্বংস করা সম্ভব হয়।
এমন উত্তেজনার মধ্যেই রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ জানিয়েছেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। রুশ সংবাদমাধ্যম আরআইএ নভোস্তিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে লাভরভ বলেন, “শান্তি সম্ভব নয় রাশিয়ার স্বার্থ বিবেচনা ছাড়া,” যা ইঙ্গিত দেয় মস্কো তাদের দাবিতে কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এখনো দাবি করে যাচ্ছেন যে, ইউক্রেনকে দোনেৎস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও জাপোরিঝিয়া অঞ্চল থেকে সম্পূর্ণভাবে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে—এই চার অঞ্চলকেই রাশিয়া নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে।
অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি স্পষ্ট করে বলেছেন, রুশ অধিকৃত অঞ্চলগুলিকে সাময়িকভাবে দখল হিসেবে স্বীকার করা যেতে পারে, কিন্তু কোনোভাবেই তা স্থায়ীভাবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়—কারণ জনগণ তাকে কখনো সেই ম্যান্ডেট দেয়নি।
দুই দেশের এই প্রতিশোধ-প্রতিশোধ খেলা যেন ইউরোপের আকাশে নতুন করে আঁধার নামাচ্ছে। যুদ্ধ এখন শুধু সীমান্তে নয়—বিদ্যুৎ, তাপ, পানি ও আশা—সবকিছুতেই ছড়িয়ে পড়েছে এর ছায়া।
















