গাজার মাটিতে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নিখোঁজ থাকা ইসরায়েলি সেনা লেফটেন্যান্ট হাদার গোলদিনের দেহাবশেষ অবশেষে ফিরে এসেছে তার মাতৃভূমিতে। ২০১৪ সালের গ্রীষ্মে হামাস যোদ্ধাদের হামলায় নিহত এই তরুণ সেনার লাশটি শনিবার রাতে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির হাতে তুলে দেয় হামাস, যা পরদিন ইসরায়েলি বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
২৩ বছর বয়সী গোলদিনের পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে ইসরায়েলি ফরেনসিক দল। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু রবিবার মন্ত্রিসভা বৈঠকে বলেন, “তার দেহ দীর্ঘদিন ধরে বন্দি ছিল, যা তার পরিবারের জন্য এক অবর্ণনীয় যন্ত্রণার বিষয়। এখন তারা তাকে ইহুদি ধর্মীয় নিয়মে সমাহিত করতে পারবে।”
হাদার গোলদিন ছিলেন ‘অপারেশন প্রোটেকটিভ এজ’-এর যোদ্ধা। ২০১৪ সালের ১ আগস্ট, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার মাত্র দুই ঘণ্টা পরই রাফাহ শহরের কাছে এক সুড়ঙ্গ অভিযানে তিনি প্রাণ হারান। হামাসের সামরিক শাখা কাসাম ব্রিগেড জানিয়েছে, তার দেহ দক্ষিণ গাজার ইয়েবনা শরণার্থী শিবিরের এক সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
এর আগে, একই যুদ্ধে নিহত আরেক ইসরায়েলি সেনা অরন শাউলের মরদেহ এ বছরেই ফেরত আসে। তবু এখনো গাজায় চারজন মৃত ইসরায়েলি বন্দির দেহাবশেষ রয়ে গেছে, যাদের ফেরত দেওয়া হবে গত মাসে শুরু হওয়া যুদ্ধবিরতির চুক্তির আওতায়।
এ পর্যন্ত হামাস ২০ জন জীবিত বন্দি ও ২৪টি মরদেহ ফেরত দিয়েছে। প্রতিটি ইসরায়েলি দেহের বিনিময়ে ইসরায়েল ১৫ জন ফিলিস্তিনির দেহাবশেষ ফিরিয়ে দিচ্ছে। গাজার নাসের মেডিকেল কমপ্লেক্সের ফরেনসিক বিভাগের পরিচালক আহমেদ দেহির জানিয়েছেন, মোট ৩০০টি মরদেহ ফেরত এসেছে, যার মধ্যে ৮৯টি শনাক্ত করা গেছে।
যুদ্ধবিরতির পরও গাজা রক্তাক্ত। ইসরায়েলি বিমান ও স্থল আক্রমণে এখন পর্যন্ত ২৪১ ফিলিস্তিনি নিহত ও ৬১৯ জন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে আরও ৫২৮টি মরদেহ।
এদিকে, যুদ্ধবিরতির পর থেকে প্রায় দুই হাজার ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দিয়েছে ইসরায়েল, যদিও এখনো দশ হাজারেরও বেশি মানুষ কারাগারে আটক আছে বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ।
রবিবারও গাজা উপত্যকার কেন্দ্রীয় বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে এক ফিলিস্তিনি নিহত হন, উত্তর ও দক্ষিণে আরও দুজন প্রাণ হারান। পশ্চিম তীরেও চলছে সহিংসতা—তুবাসের ফারা শরণার্থী শিবিরে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে এক ফিলিস্তিনি নিহত হন এবং ইসরায়েলি বসতিরা একাধিক স্থানে ফিলিস্তিনি কৃষকদের ওপর হামলা চালায়।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় ইসরায়েলে নিহত হয় কমপক্ষে ১১৩৯ জন, আর বন্দি করা হয় ২৫১ জনকে। সেই থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলের গাজা অভিযান এখন পর্যন্ত প্রাণ কেড়েছে অন্তত ৬৮ হাজার ৮৭৫ ফিলিস্তিনির, আহত করেছে এক লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষকে।
এক যুগ আগের এক তরুণ সৈনিকের লাশ ফিরে এসেছে তার মায়ের কোলে—কিন্তু গাজার মাটিতে এখনো ছড়িয়ে আছে হাজারো নিথর দেহ, যাদের কোনো নাম নেই, কোনো প্রার্থনা নেই, কেবল যুদ্ধের প্রতিধ্বনি।
















