নাইজেরিয়ায় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সদস্যদের ব্যাপক আত্মসমর্পণ দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতির ইঙ্গিত দিলেও, ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যায়বিচার ও পুনর্বাসন নিশ্চিত না হলে তা ভবিষ্যতে নতুন সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা।
নাইজেরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী গত ২৯ জুন জানায়, দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পরিচালিত অপারেশন হাদিন কাই (Operation Hadin Kai)-এর ধারাবাহিক সামরিক চাপের মুখে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সন্ত্রাসী কমান্ডার আত্মসমর্পণ করেছেন। আত্মসমর্পণকারীদের বর্তমানে নিরাপদ স্থানে রেখে যাচাই-বাছাই ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
বিস্তৃত হয়েছে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক
২০০৯ সালে বোকো হারামের বিদ্রোহের মাধ্যমে শুরু হওয়া সংকট এখন বহু সশস্ত্র গোষ্ঠীতে বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে বোকো হারাম, আইএসডব্লিউএপি (ISWAP), আনসারু, লাকুরাওয়া, মাহমুদাসহ বিভিন্ন জঙ্গি ও সশস্ত্র অপরাধী চক্র উত্তর-পূর্ব নাইজেরিয়ায় সক্রিয় রয়েছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সামরিক অভিযানের পাশাপাশি সরকার অপারেশন সেফ করিডোর (Operation Safe Corridor)-এর মাধ্যমে আত্মসমর্পণকারী নিম্ন-ঝুঁকির সদস্যদের পুনর্বাসন, উগ্রবাদমুক্তকরণ এবং সমাজে পুনঃএকীভূত করার কর্মসূচি চালু করেছে।
আত্মসমর্পণের সংখ্যা বাড়ছে
নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বোলা আহমেদ টিনুবু জানান, ২০২৩ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ১ লাখ ২৪ হাজারেরও বেশি যোদ্ধা ও তাদের নির্ভরশীল ব্যক্তি আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে।
প্রতিরক্ষা সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ৩ লাখের বেশি ব্যক্তি আত্মসমর্পণ করেছে এবং ২,৬১৫ জন পুনর্বাসন কর্মসূচি সম্পন্ন করে সমাজে ফিরেছে।
সরকারের মতে, এই কর্মসূচি সামরিক অভিযানের কার্যকারিতা বাড়িয়েছে, মূল্যবান গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে সহায়তা করেছে এবং সহিংসতা কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।
ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ
তবে মানবাধিকার ও নীতিনির্ধারণী বিশ্লেষকদের মতে, পুনর্বাসন কার্যক্রমে একটি বড় বৈষম্য তৈরি হয়েছে।
Observatory for Religious Freedom in Africa-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সন্ত্রাসী হামলায় ৭৯ হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং ৩৪ হাজারের বেশি মানুষ অপহৃত হয়েছে। একই সময়ে নাইজেরিয়ায় বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৭ লাখ।
সমালোচকদের মতে, একদিকে আত্মসমর্পণকারী সাবেক যোদ্ধারা কাউন্সেলিং, শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন সহায়তা পাচ্ছেন; অন্যদিকে বহু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এখনও শরণার্থী শিবিরে খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সংকটে দিন কাটাচ্ছে।
এ পরিস্থিতি অনেক ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করছে এবং তারা মনে করছে, অপরাধীরা পুনর্বাসনের সুযোগ পাচ্ছে, অথচ ভুক্তভোগীরা উপযুক্ত সহায়তা বা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
পুনঃএকীভূতকরণ নিয়ে উদ্বেগ
স্থানীয় পর্যায়ে আরও উদ্বেগ রয়েছে যে, কিছু সাবেক জঙ্গি সরকারি পুনর্বাসন কর্মসূচি সম্পন্ন না করেই নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই ছাড়া সমাজে ফিরে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ কেউ আবারও উগ্রপন্থায় জড়িয়ে পড়তে পারে, যা সামাজিক সম্প্রীতি ও নিরাপত্তার জন্য নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি করবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর মতামত ও অংশগ্রহণ ছাড়া পরিচালিত পুনর্বাসন কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদে গ্রহণযোগ্যতা হারাতে পারে এবং প্রতিশোধ, সামাজিক বিভাজন বা স্থানীয় সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
স্থায়ী শান্তির জন্য ভারসাম্য জরুরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মসমর্পণ ও পুনর্বাসন সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দুর্বল করার ক্ষেত্রে কার্যকর হলেও, একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের জন্য ক্ষতিপূরণ, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, পুনর্বাসন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
তাদের মতে, সন্ত্রাসবিরোধী নীতির সফলতা তখনই নিশ্চিত হবে, যখন সাবেক যোদ্ধাদের পুনঃএকীভূত করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের আস্থা পুনর্গঠন ও সামাজিক ন্যায়বিচারও সমান গুরুত্ব পাবে।
















