ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসাম ক্রমেই দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চলে পরিণত হচ্ছে। চীন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের নিকটবর্তী অবস্থান, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে নয়াদিল্লি এখন আসামকে শুধু সীমান্ত রাজ্য নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে আসামের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নিয়েছে ভারত। এ প্রক্রিয়ায় জাপানকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
একসময় ভাষা আন্দোলন, জাতিগত সংঘাত, স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং অবৈধ অনুপ্রবেশের মতো অভ্যন্তরীণ সমস্যায় দীর্ঘদিন পিছিয়ে ছিল আসাম। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব ভারতের নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি নতুনভাবে আকর্ষণ করেছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চীন বাংলাদেশ, নেপাল ও মিয়ানমারে বিভিন্ন অবকাঠামো, জ্বালানি ও বন্দর প্রকল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার করছে। এর ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং পূর্বমুখী কৌশল বাস্তবায়নে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংযোগকারী সরু স্থলপথ, যা সাধারণভাবে ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত, এখনো দেশটির অন্যতম স্পর্শকাতর কৌশলগত এলাকা। এই করিডরে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে ভারতের স্থল যোগাযোগ ও সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
দুই হাজার সতেরোর সীমান্ত অচলাবস্থার ঘটনাও এই করিডরের কৌশলগত গুরুত্বকে সামনে নিয়ে আসে। একই সঙ্গে অরুণাচল অঞ্চল নিয়ে চীনের দাবি এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণ ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে ঘিরেও ভারতের উদ্বেগ রয়েছে। চীনের সহায়তায় বন্দর, শিল্পাঞ্চল ও অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধিকে নয়াদিল্লি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এসব উন্নয়নকে ভারতের কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে ভারতও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। নতুন রেলপথ, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে অঞ্চলটির অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জাপানের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার সহায়তায় আসামে সেতু নির্মাণ, নগর পানি সরবরাহ এবং শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার কাজ চলছে। পাশাপাশি প্রযুক্তি, শিক্ষা ও গবেষণা ক্ষেত্রেও ভারত ও জাপানের সহযোগিতা বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জাপানের বিনিয়োগ শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, বরং চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশ থেকে কথিত অবৈধ অনুপ্রবেশের মতো বিষয় এখনো আসামের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিল্পায়নের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। বড় অঙ্কের বেসরকারি বিনিয়োগ, আধুনিক শিল্পপ্রকল্প, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে ওঠায় আসামকে ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বিনিয়োগ কেন্দ্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা, অবকাঠামো উন্নয়ন, আঞ্চলিক সংযোগ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব—এই চারটি বিষয়ের সমন্বয়ের মাধ্যমে আসাম আগামী দিনে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে আরও শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলতে পারে।
















