আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় নতুন করে শত শত কোটি ডলারের সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই সহায়তার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন শর্তের কারণে কয়েকটি আফ্রিকান দেশ প্রস্তাব গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করেছে।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক সহায়তা কার্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তনের পর নতুন স্বাস্থ্য সহযোগিতা নীতির আওতায় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা চুক্তি করা হচ্ছে। এই নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে নিজেদের স্বাস্থ্যখাতে বেশি বিনিয়োগে উৎসাহিত করা, যাতে ভবিষ্যতে তারা বিদেশি সহায়তার ওপর কম নির্ভরশীল হয়।
পূর্ব আফ্রিকার একটি দেশের সঙ্গে পাঁচ বছরের জন্য বড় অঙ্কের স্বাস্থ্য সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর হলেও আইনি জটিলতার কারণে তা বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়েছে। ওই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট দেশ উভয়ই স্বাস্থ্যখাতে উল্লেখযোগ্য অর্থ বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, আগের মতো বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে সহায়তা দেওয়ার পরিবর্তে সরাসরি সরকারগুলোর সঙ্গে কাজ করলে স্বাস্থ্যব্যবস্থা আরও টেকসই হবে এবং বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা কমবে।
তবে সমালোচকদের মতে, নতুন নীতির মাধ্যমে বৈশ্বিক সহযোগিতার পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র নিজের কৌশলগত ও বাণিজ্যিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। প্রস্তাবিত চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ ও চিকিৎসা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশেষ সুবিধা রাখার বিষয়টিও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
এ পর্যন্ত লাতিন আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং আফ্রিকার অন্তত ২০টিসহ মোট ৩২টি দেশ এই ধরনের স্বাস্থ্য সহযোগিতা চুক্তিতে সম্মতি দিয়েছে। তবে ঘানা, জিম্বাবুয়ে ও জাম্বিয়াসহ কয়েকটি দেশ বিভিন্ন কারণে এতে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
জাম্বিয়া অভিযোগ করেছে, স্বাস্থ্য সহায়তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ ব্যবহারের আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। দেশটির সরকার জানিয়েছে, দুটি বিষয় আলাদাভাবে বিবেচনা করা উচিত।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, বিদেশি সহায়তা কেবল মানবিক উদ্যোগ নয়, বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষারও একটি মাধ্যম। তাই অংশীদার দেশগুলোর কাছ থেকেও তারা নিজেদের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত অগ্রাধিকারকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রত্যাশা করে।
স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য ও জীবাণুবিষয়ক উপাত্ত বিদেশে পাঠানোর শর্ত নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ঘানার তথ্য সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একবার দেশের বাইরে তথ্য চলে গেলে সেগুলোর ওপর তাদের আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এ কারণে দেশটি প্রস্তাবিত চুক্তি গ্রহণ করেনি।
জিম্বাবুয়েও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। দেশটির মতে, রোগজীবাণু বা স্বাস্থ্য তথ্য ভাগ করে নেওয়ার বিনিময়ে ভবিষ্যতে তৈরি হওয়া ওষুধ বা টিকার ন্যায্য সুবিধা পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না।
যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য বলছে, গবেষণা ও সংক্রামক রোগ মোকাবিলার স্বার্থে যে তথ্য সংগ্রহ করা হবে তা ব্যক্তিগত পরিচয়বিহীন এবং বহু বছর ধরেই এ ধরনের তথ্য আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য গবেষণায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক মহামারির অভিজ্ঞতার পর আফ্রিকার দেশগুলো স্বাস্থ্য তথ্য ও রোগজীবাণুর কৌশলগত গুরুত্ব সম্পর্কে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন হয়েছে। ফলে তারা এখন নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
এদিকে মধ্য আফ্রিকার একটি দেশে সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী রোগের প্রাদুর্ভাবের সময় আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জনবল সংকট দেখা দেয় বলে বিভিন্ন মানবিক সংস্থা অভিযোগ করেছে। তাদের দাবি, আগের সহায়তা কাঠামো বহাল থাকলে পরিস্থিতি মোকাবিলা আরও দ্রুত সম্ভব হতো।
তবে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, নতুন ব্যবস্থার অধীনে তাদের সহায়তা আগের তুলনায় আরও কার্যকর ও সমন্বিত হয়েছে এবং সাম্প্রতিক রোগ প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় তারা উল্লেখযোগ্য অর্থ সহায়তা দিয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সংক্রামক রোগ কোনো দেশের সীমানা মানে না। তাই বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় একক বা দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সমন্বয়ও অপরিহার্য।
















