নিউ ইয়র্কের নতুন ইতিহাস লিখলেন মুসলিম বংশোদ্ভূত জোহরান মামদানি। শহরটির প্রথম মুসলিম মেয়র নির্বাচিত হয়ে তিনি ভেঙেছেন বহু বছরের ধর্মীয় বিভাজনের দেয়াল। কিন্তু তাঁর বিজয়ের পথ ছিল কাঁটায় ভরা। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে একদিকে ডানপন্থী উসকানিদাতা ও সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবশালী কণ্ঠ, অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পক্ষ থেকে ছড়ানো ঘৃণার ঝড়—সব মিলিয়ে মামদানিকে লক্ষ্য করে ইসলামভীতির বিষবাষ্প ছড়িয়েছিল আমেরিকার রাজনীতি।
রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়া তাঁকে অভিযুক্ত করেছিলেন “বিশ্বজুড়ে জিহাদে সমর্থন” দেওয়ার জন্য। সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুয়োমো এমনকি বলেছিলেন, মামদানি হয়তো “আরেকটি ৯/১১” উদযাপন করবেন। তৎকালীন মেয়র এরিক অ্যাডামস মন্তব্য করেছিলেন, মামদানি জয়ী হলে নিউ ইয়র্ক “ইউরোপের মতো হয়ে যাবে, যেখানে ইসলামিক চরমপন্থীরা সমাজ ধ্বংস করছে।”
এই বিষাক্ত প্রচারণা কেবল এক ব্যক্তিকে নয়, গোটা মুসলিম সম্প্রদায়কেই আঘাত করেছে। ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল পলিসি অ্যান্ড আন্ডারস্ট্যান্ডিং (ISPU)-এর সাম্প্রতিক গবেষণা দেখাচ্ছে, গত তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামভীতি বা ইসলামোফোবিয়া আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
তাদের ইসলামোফোবিয়া সূচক অনুযায়ী, ২০২২ সালে মার্কিন জনগণের গড় মান ছিল ২৫, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩। সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি দেখা গেছে শ্বেতাঙ্গ ইভানজেলিকাল খ্রিষ্টানদের মধ্যে—৩০ থেকে ৪৫। ক্যাথলিকদের মধ্যে সূচক বেড়েছে ২৮ থেকে ৪০। প্রোটেস্টান্টদের ক্ষেত্রেও বৃদ্ধি ঘটেছে, ২৩ থেকে ৩০। এমনকি ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যেও সামান্য উত্থান হয়েছে—১৭ থেকে ১৯।
এই প্রবণতার মূল কারণ, গবেষকদের মতে, প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের দ্বারা ইসলামভীতিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা। নির্বাচনের সময় মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো যেন এখন রাজনৈতিক কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে—যার পরিণতি কর্মসংস্থান হারানো থেকে শুরু করে ধর্মীয় নিপীড়ন, স্কুলে মুসলিম শিশুদের ওপর হয়রানি, এমনকি শারীরিক সহিংসতা পর্যন্ত গড়াচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ইসলামভীতির মূল পাঁচটি ধারণা ঘিরেই এই বিদ্বেষ বিস্তার পেয়েছে—মুসলমানরা সহিংসতাকে সমর্থন করে, তারা নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন, তারা কম সভ্য, এবং বিশ্বের অন্য প্রান্তে মুসলমানদের করা সহিংসতার জন্য তারাও দায়ী।
কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। গবেষণা বলছে, আমেরিকান মুসলমানরা সামরিক কিংবা ব্যক্তি পর্যায়ে বেসামরিক নাগরিকের ওপর কোনো সহিংসতা সমর্থন করেন না; বরং তারা অন্যদের তুলনায় বেশি শান্তিপ্রিয়। মুসলিম নারীরাও তাঁদের ধর্মকে শক্তির উৎস বলে মনে করেন, নিপীড়নের নয়। তাঁদের ৯৯ শতাংশই বলেন, তাঁরা হিজাব পরেন সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও ভালোবাসা থেকে।
আরেকটি মিথ হলো—মুসলমানরা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি অনুগত নন। অথচ তথ্য বলছে, ধর্মীয়ভাবে দৃঢ় মুসলমানরাই নিজেদের আমেরিকান পরিচয়ে সবচেয়ে গর্বিত। তাঁরা স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে সমাজসেবায় সক্রিয়, প্রতিবেশীদের সঙ্গে মিলে কাজ করেন, জাতীয় সঙ্কটে সহযোগিতা দেন—যেমনটি দেখা গেছে কোভিড মহামারি বা ফ্লিন্টের পানি বিপর্যয়ের সময়।
গবেষকরা সতর্ক করেছেন, ইসলামভীতির এই সাংগঠনিক প্রসার কেবল মুসলমানদেরই ক্ষতি করছে না—এটি আমেরিকার গণতন্ত্রের জন্যও হুমকি। কারণ এই মনোভাব যত বাড়ে, ততই বাড়ে কর্তৃত্ববাদী নীতিকে মেনে নেওয়ার প্রবণতা, সংবিধানের স্বাধীনতা সংকুচিত করার ইচ্ছা।
জোহরান মামদানি তাঁর নির্বাচনী বিজয় ভাষণে বলেছেন, “এখন থেকে নিউ ইয়র্ক হবে না এমন এক শহর, যেখানে ইসলামভীতিকে হাতিয়ার করে কেউ ক্ষমতায় উঠতে পারে।”
তাঁর এই কথা যেন আমেরিকার রাজনীতিতে এক নতুন প্রতিশ্রুতি বয়ে আনে—একটি দেশ, যেখানে ভয় নয়, মানবতার বিশ্বাসই হবে রাজনীতির চালিকাশক্তি।
















