ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্য মণিপুরে দীর্ঘ তিন বছর ধরে চলা জাতিগত সংঘাত এখনো থামেনি। সাম্প্রতিক সহিংসতা আবারও পরিস্থিতিকে অস্থির করে তুলেছে, তৈরি হয়েছে নতুন করে বড় সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা।
সর্বশেষ সহিংসতার সূত্রপাত ঘটে একটি বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায়, যেখানে দুই শিশু নিহত হয়। এ ঘটনার পর রাজ্যজুড়ে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়। এতে নতুন করে প্রাণহানি ও আহতের ঘটনা ঘটে।
মণিপুর মূলত দুটি প্রধান জনগোষ্ঠীতে বিভক্ত—সমতলে বসবাসকারী মেইতেই এবং পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসকারী কুকি-জো সম্প্রদায়। বহুদিন ধরে ভূমি, পরিচয় ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে এই দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা চলে আসছে।
সংঘাতের বড় মোড় আসে ২০২৩ সালে, যখন আদালতের একটি সিদ্ধান্তে মেইতেই সম্প্রদায়কে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত আদিবাসী মর্যাদা দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এতে কুকি-জো জনগোষ্ঠীর মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয় যে তাদের জন্য সংরক্ষিত সুযোগ-সুবিধা কমে যাবে। এর পরই শুরু হয় ব্যাপক সহিংসতা।
গত তিন বছরে এই সংঘাতে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। বর্তমানে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন এতটাই গভীর যে তারা আলাদা এলাকায় বসবাস করছে, মাঝখানে রয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত বাফার জোন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাতের মূল কারণ কেবল সাম্প্রতিক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের ভূখণ্ড দাবি, জাতিগত পরিচয় ও রাজনৈতিক স্বার্থের জটিল দ্বন্দ্ব। বিভিন্ন গোষ্ঠী একই ভূখণ্ডের ওপর দাবি জানানোয় সংঘাত আরও জটিল হয়েছে।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, শুরুতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংঘাত স্থায়ী বিভাজনে রূপ নেয়।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো ভঙ্গুর। রাজ্যে বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন থাকলেও সহিংসতা পুরোপুরি থামানো যায়নি। অনেক এলাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত, কৃষিকাজ বন্ধ এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, এই অস্থিরতার মধ্যে কিছু গোষ্ঠী লাভবান হচ্ছে—বিশেষ করে অবৈধ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা। এতে করে পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
সব মিলিয়ে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর সংলাপ এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ছাড়া মণিপুরে শান্তি ফেরানো কঠিন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
















