ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সহযোগিতা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে কাজ করছে নয়াদিল্লি, তবে এই পুনর্গঠন কতটা স্থায়ী হবে তা নির্ভর করছে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির ওপর।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নতুন করে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করছেন। তবে কূটনৈতিক সৌজন্যের বাইরে গিয়ে সম্পর্ককে টেকসই করতে হলে প্রয়োজন অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও নীতিগত কাঠামোতে গভীর সমন্বয়।
দুই দেশের বাণিজ্য বর্তমানে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছালেও এতে বড় ধরনের অসমতা রয়েছে। ভারত বছরে প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে, যেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি তুলনামূলকভাবে অনেক কম। এই বৈষম্য বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংযোগ বা কানেক্টিভিটি খাতকে এই ভারসাম্য আনার গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত এক দশকে দুই দেশ একাধিক রেলপথ পুনরায় চালু করেছে, নৌপথ সম্প্রসারণ করেছে এবং সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন চুক্তি বাস্তবায়ন করেছে। আগরতলা-আখাউড়া রেল সংযোগ চালু হওয়া এবং চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের অনুমতি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
ভারতের জন্য এই পথ ব্যবহার করলে পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে, অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য এটি আঞ্চলিক বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি করে। তবে এই সুবিধা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত নীতিমালা, কাস্টমস ব্যবস্থা সহজীকরণ এবং অবকাঠামো উন্নয়ন—যেখানে অগ্রগতি এখনও অসমান।
বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কও এই সমীকরণে নতুন চাপ তৈরি করেছে। অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে চীনের বিনিয়োগ বেড়েছে, যা বাংলাদেশকে বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো প্রতিযোগিতামূলক ও বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা।
ভারতের অনেক প্রকল্প বিলম্ব, জটিলতা ও অর্থায়ন সমস্যায় ভুগেছে, যেখানে চীনের প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য পরিচিত। ফলে ভারতকে এখন দ্রুত বাস্তবায়ন, স্বচ্ছ অর্থায়ন এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো জোরদার করা জরুরি। সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা এবং তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে নিয়মিত ও আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
এছাড়া পানি বণ্টন, অভিবাসন ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো এখনো অমীমাংসিত। এসব ক্ষেত্রে যৌথ নদী ব্যবস্থাপনা, বিরোধ নিষ্পত্তি কাঠামো এবং তথ্য বিনিময় চুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাও দুই দেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। দুর্যোগ মোকাবিলা, উপকূলীয় সুরক্ষা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে যৌথ উদ্যোগ সম্পর্ককে আরও বাস্তবভিত্তিক করতে পারে।
বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ এবং ভারতের পূর্বমুখী নীতির মধ্যে একটি কৌশলগত সংযোগ তৈরি হয়েছে। সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা গেলে এটি দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত নির্ভরতা বাড়াতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি দুই দেশ আবেগ নয়, বরং কাঠামোগত সহযোগিতার ওপর জোর দেয়, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি হতে পারে—যেখানে রাজনৈতিক পরিবর্তন সত্ত্বেও সম্পর্ক স্থিতিশীল থাকবে এবং পারস্পরিক স্বার্থ অগ্রাধিকার পাবে।
















