মৃত্যুর ৭০ শতাংশই এখন অসংক্রামক রোগে; হাম ও ডেঙ্গুর মতো সংক্রামক রোগও দিচ্ছে নতুন হানা
বিংশ শতাব্দীর শেষে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে অভাবনীয় সাফল্য পেলেও একবিংশ শতাব্দীতে এসে বাংলাদেশ ‘ডাবল বার্ডেন অব ডিজিজ’ বা রোগের দ্বৈত বোঝার মুখে দাঁড়িয়েছে। একদিকে ডায়াবেটিস, ক্যানসার ও হৃদ্রোগের মতো অসংক্রামক রোগের ভয়াবহ বিস্তার, অন্যদিকে হাম ও ডেঙ্গুর মতো সংক্রামক রোগের পুনরুত্থান—এই দুইয়ের চাপে পিষ্ট হচ্ছে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, কোনো দেশে যখন দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগ এবং সংক্রামক রোগ সমান্তরালভাবে জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তাকেই ‘দ্বৈত বোঝা’ বলা হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে মোট মৃত্যুর দুই-তৃতীয়াংশের বেশি (প্রায় ৭০.২৬%) ঘটে অসংক্রামক রোগে। অথচ তিন দশক আগেও চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ উল্টো।
অসংক্রামক রোগের উদ্বেগজনক চিত্র:
- মৃত্যুহার: বর্তমানে দেশে হৃদ্রোগে ৩৪%, ক্যানসারে ১০% এবং দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগে ৭% মানুষের মৃত্যু ঘটছে। এছাড়া উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ ও স্থূলতা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
- বিবর্তনের পরিসংখ্যান: ১৯৮৬ সালে অসংক্রামক রোগে মৃত্যু ছিল মাত্র ৮%, যা ২০০৬ সালে বেড়ে ৬৮% এবং বর্তমানে ৭০% ছাড়িয়েছে।
- ঝুঁকির কারণ: অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, কায়িক পরিশ্রমের অভাব, তামাকের ব্যবহার এবং দ্রুত নগরায়ণ এই রোগের প্রধান অনুঘটক।
সংক্রামক রোগের নতুন চ্যালেঞ্জ: সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে (যেমন পোলিও বা কালাজ্বর নির্মূল) সাফল্য থাকলেও ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি।
- নতুন প্রাদুর্ভাব: সম্প্রতি দেশজুড়ে হামের প্রকোপ এবং নিয়মিত ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণ জনস্বাস্থ্যকে নতুন সংকটে ফেলেছে।
- এমডিআর জীবাণু: অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী (MDR) জীবাণুর বিস্তার চিকিৎসকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
- মৃত্যু: যক্ষ্মা, ডায়রিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ এখনো উল্লেখযোগ্য মৃত্যু ঘটায় (প্রায় ২৩%)।
বিশেষজ্ঞ ও সরকারের পদক্ষেপ: জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফয়সালের মতে, কেবল বড় হাসপাতাল বা আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা এবং তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যশিক্ষা বাড়ানো।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, এই দ্বৈত বোঝা মোকাবিলায় সরকার এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করছে। সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ এবং অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত কার্যক্রমের ওপর জোর দিচ্ছে মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোই হতে পারে এই বিশাল চিকিৎসা ব্যয় ও অকাল মৃত্যু ঠেকানোর একমাত্র কার্যকর পথ।
















