ইরানের দক্ষিণ উপকূল প্রায় ১৮০০ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত, যা পশ্চিমে ইরাকের বদ্বীপ অঞ্চল থেকে পূর্বে পাকিস্তানের সীমান্ত পর্যন্ত প্রসারিত। এই বিস্তৃত উপকূলরেখার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালী, যা বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ।
এই উপকূলজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে একাধিক কৌশলগত দ্বীপ, বন্দর ও জ্বালানি স্থাপনা, যা ইরানের সামরিক, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক শক্তির ভিত্তি গড়ে তুলেছে।
ইরানের দুটি উপকূল রয়েছে—উত্তরে কাস্পিয়ান সাগর এবং দক্ষিণে উপসাগরীয় অঞ্চল। দক্ষিণাঞ্চলে ৩০টিরও বেশি দ্বীপ রয়েছে, যেগুলোর অনেকগুলো হরমুজ প্রণালীর আশপাশে অবস্থিত এবং প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করেছে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। যদিও প্রণালীর প্রস্থ খুব বেশি নয়, বড় জাহাজ চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট সরু পথ ব্যবহার করতে হয়, যা সহজেই নিয়ন্ত্রণযোগ্য।
লারাক দ্বীপ হরমুজ প্রণালীর একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থান। ছোট আকারের হলেও এটি সমুদ্রপথ পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান এই দ্বীপের আশপাশ দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে।
হরমুজ দ্বীপও একইভাবে প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে। এটি মূল ভূখণ্ডের খুব কাছাকাছি হওয়ায় সামরিক ও পর্যটন—দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্ব বহন করে।
বান্দার আব্বাস ইরানের প্রধান বাণিজ্যিক বন্দর এবং নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। এখান থেকে দেশটির সামুদ্রিক কার্যক্রম পরিচালিত হয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে সংযোগ বজায় থাকে।
কেশম দ্বীপ উপসাগরের সবচেয়ে বড় দ্বীপ। এটি একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল এবং একই সঙ্গে শিল্প ও সামরিক কার্যক্রমের কেন্দ্র। এখানে সামরিক স্থাপনা থাকার কথাও ধারণা করা হয়।
দক্ষিণে অবস্থিত আবু মুসা, গ্রেটার তুনব ও লেসার তুনব দ্বীপগুলো নিয়ে আঞ্চলিক বিরোধ রয়েছে। এই দ্বীপগুলো ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সংযুক্ত আরব আমিরাত দাবি করে। এগুলো থেকে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ পর্যবেক্ষণ করা যায়।
আসালুইয়েহ অঞ্চল ইরানের জ্বালানি খাতের কেন্দ্র। এখানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গ্যাসক্ষেত্রের অংশ অবস্থিত, যা দেশের অধিকাংশ গ্যাস সরবরাহ করে।
বুশেহর শহরে ইরানের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অবস্থিত। এটি সামরিক ও জ্বালানি—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।
খার্গ দ্বীপ ইরানের তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এখান থেকে রপ্তানি হয়। গভীর সমুদ্রবন্দর থাকায় বড় তেলবাহী জাহাজ সহজেই এখানে ভিড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই উপকূলীয় অঞ্চল, দ্বীপ ও জ্বালানি অবকাঠামো মিলেই ইরানের কৌশলগত শক্তির মূল ভিত্তি গড়ে উঠেছে, যা আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।
















