ইসরায়েল এখন আর শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, লড়ছে জনমতের ময়দানে। যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের হৃদয় ও মন জয়ের লক্ষ্যে দেশটি চুক্তিবদ্ধ হয়েছে কমপক্ষে তিনটি মার্কিন জনসংযোগ সংস্থার সঙ্গে— “ব্রিজেস পার্টনার্স”, “শো ফেইথ বাই ওয়ার্কস” এবং “ক্লক টাওয়ার এক্স”। এই সংস্থাগুলোর নাম উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগে বিদেশি এজেন্ট নিবন্ধন আইনের (FARA) নথিতে।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইউরোপীয় হাভাস মিডিয়া গ্রুপের মাধ্যমে এই সংস্থাগুলোর সঙ্গে চুক্তি করে। লক্ষ্য একটাই— দেশের অনলাইন ভাবমূর্তি পুনর্গঠন এবং যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল ও খ্রিস্টান ডানপন্থীদের সমর্থন ফিরিয়ে আনা, যা গাজায় গণহত্যার অভিযোগের পর ক্রমেই কমে যাচ্ছে।
ইসরায়েল জানে, এই যুদ্ধে তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হতে পারে প্রচার— মিথ ও তথ্যের যুদ্ধ। গাজার ধ্বংসস্তূপে ৬৮ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনির প্রাণহানির পর বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েল পরিকল্পিতভাবে অনলাইন প্রচারণা চালাচ্ছে যাতে যুদ্ধের বর্ণনা নিজেদের পক্ষে ঘোরানো যায়।
কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সত্যের ছবিগুলো— ধ্বংস, লাশ, কান্না— ভাইরাল হতে থাকায় এই প্রচারণা ব্যর্থ হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু নিজেও স্বীকার করেছেন, “সোশ্যাল মিডিয়া এখন এক ভয়ংকর অস্ত্র”, এবং প্রো-ইসরায়েল ধনকুবেরদের নেতৃত্বে টিকটক কেনাকে তিনি বলেছেন “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ”।
‘শো ফেইথ বাই ওয়ার্কস’ সংস্থাটি ৩.২ মিলিয়ন ডলারের একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যার লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের চার্চগুলোর মধ্যে “ইসরায়েল সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করা” এবং ফিলিস্তিনিদের “চরমপন্থী হিসেবে উপস্থাপন” করা। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় “জিওফেন্সিং ও খ্রিস্টান টার্গেটিং ক্যাম্পেইন” পরিচালনার। এই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট অঞ্চলের (বিশেষ করে চার্চ বা খ্রিস্টান বিশ্ববিদ্যালয়) মোবাইল ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে প্রচারণা চালানো হবে।
এ ছাড়াও তারা “১০/৭ এক্সপেরিয়েন্স” নামের একটি ভার্চুয়াল রিয়েলিটি প্রদর্শনী চালু করতে যাচ্ছে— ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলাকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হবে এই অভিজ্ঞতা। এতে থাকবে ভিআর হেডসেট, সেট পিস, এবং বড় পর্দায় ইন্টারঅ্যাকটিভ প্রদর্শনী। নথিতে উল্লেখ আছে, জনপ্রিয় খ্রিস্টান অভিনেতা ক্রিস প্র্যাট ও জন ভয়েটের মতো তারকাদেরও এই প্রচারণায় যুক্ত করা হতে পারে।
অন্যদিকে ‘ক্লক টাওয়ার এক্স’ সংস্থাটি নিয়োজিত হয়েছে তরুণ প্রজন্ম, বিশেষত জেনারেশন জেডের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে। তারা ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রামসহ সামাজিক মাধ্যম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্ল্যাটফর্ম— যেমন ChatGPT, Gemini ও Grok-এর মাধ্যমে প্রচারণা চালাবে। এই কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক লক্ষ্য “অ্যান্টি-সেমিটিজম মোকাবিলা”, যদিও বাস্তবে তা গাজা যুদ্ধের বিরুদ্ধে উঠা সমালোচনাকে স্তব্ধ করার প্রচেষ্টা।
মিডিয়া বিশ্লেষক মার্ক ওয়েন জোনসের মতে, “যদি তারা পর্যাপ্ত পরিমাণ অনলাইন কনটেন্ট তৈরি করতে পারে, তাহলে AI মডেলগুলোতেও সেই পক্ষপাত ঢুকিয়ে দেওয়া সম্ভব।” তিনি একে বলেন “RAG poisoning”— অর্থাৎ এমন ডেটা প্লাবন তৈরি করা যাতে সত্য ও মিথ্যার সীমা ঝাপসা হয়ে যায়।
এই প্রচারণার নেতৃত্বে আছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক উপদেষ্টা ব্র্যাড পারস্কেল। ‘ক্লক টাওয়ার এক্স’-এর কনটেন্ট যুক্ত করা হচ্ছে ডানপন্থী খ্রিস্টান নেটওয়ার্ক সেলেম মিডিয়ার সঙ্গে, যারা সম্প্রতি ট্রাম্প পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অংশীদারিত্ব ঘোষণা করেছে।
এদিকে ‘ব্রিজেস পার্টনার্স’ সংস্থা ১৪ থেকে ১৮ জন গোপন ইনফ্লুয়েন্সারকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রভাবিত করার জন্য নিয়োগ দিয়েছে। প্রতিজন ইনফ্লুয়েন্সার পাচ্ছেন প্রায় ৭ হাজার ডলার করে প্রতি পোস্টে। এই তথ্য ফাঁস হওয়ার পর ইন্টারনেটে “$7000 পোস্ট” হয়ে উঠেছে বিদ্রুপের প্রতীক— সন্দেহভাজন পোস্টের নিচে ব্যবহারকারীরা এই পরিমাণ লিখে বোঝাচ্ছেন, “এটি ইসরায়েলি প্রোপাগান্ডা।”
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অজ্ঞাত পরিচয় প্রভাবকরা যদি পেইড কনটেন্টের উৎস গোপন রাখেন, তা যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী অবৈধ হতে পারে।
যদিও প্রচারণার ফলাফল এখনো অনিশ্চিত, বিশ্লেষকরা বলছেন— সত্যকে ছাপিয়ে মিথ্যা স্থায়ী হয় না। মার্ক ওয়েন জোনস বলেন, “তারা যতই কৃত্রিম তথ্য বানাক, গাজার বাস্তব দৃশ্যের সঙ্গে তা টিকবে না। তবে এই প্রচারণা যুদ্ধের নৈতিক চিত্রকে অস্পষ্ট করে তুলতে পারে, যেন দুই পক্ষ সমানভাবে দায়ী।”
এই বিষয়ে যোগাযোগ করা হলেও ব্রিজেস পার্টনার্স, ক্লক টাওয়ার এক্স, শো ফেইথ বাই ওয়ার্কস বা ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কেউ মন্তব্য করেনি।















