গত বছরের ভয়াবহ ট্রেন স্টেশন ধসের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে সার্বিয়াজুড়ে নেমেছে তরুণদের ঢল। রাজধানী বেলগ্রেড থেকে শুরু করে দেশজুড়ে হাজারো শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারী পদযাত্রা করছেন উত্তরাঞ্চলের শহর নভি সাদের দিকে, যেখানে অনুষ্ঠিত হবে এক বিশাল সমাবেশ।
২০২৪ সালের ১ নভেম্বরের সেই করুণ দিনটিতে এক ট্রেন স্টেশনের ছাদ ধসে মারা যান ১৬ জন, যার মধ্যে ছিল চারটি শিশুও। সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা দেশজুড়ে সৃষ্টি করে তীব্র ক্ষোভ, যা পরিণত হয় সার্বিয়ার সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী আন্দোলনে। আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, সরকারের দুর্নীতি ও অবহেলাই এই ট্র্যাজেডির মূল কারণ। তারা প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুচিচের পদত্যাগ ও আগাম নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছেন, যা তিনি উপেক্ষা করেছেন।
বৃহস্পতিবার বেলগ্রেডে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পতাকা হাতে ৯০ কিলোমিটার (৫৬ মাইল) দীর্ঘ পদযাত্রা শুরু করেন নভি সাদের উদ্দেশে। সেখানে শনিবার তারা যোগ দেবেন আরও হাজারো বিক্ষোভকারীর সঙ্গে। কেউ কেউ আরও দূর থেকে হেঁটে আসছেন—যেমন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নোভি পাজার শহর থেকে, যা নভি সাদ থেকে ৩০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে।
নোভি পাজারের শিক্ষার্থী এমিনা স্পাহিচ আল জাজিরাকে বলেন, “আমরা এই পথে হেঁটে আসছি ১৬ প্রাণের জন্য—যাদের মৃত্যুর এক বছর পরও কেউ দায় স্বীকার করেনি।” তার সহপাঠী এনেস জোগোভিচ জানান, “পথে পথে মানুষ আমাদের সাহায্য করেছে, খাবার-পানীয় দিয়েছে। এমনকি সবচেয়ে দূরবর্তী গ্রামগুলো থেকেও আমরা ভালোবাসা পেয়েছি।”
ট্রেন দুর্ঘটনার প্রতিবাদ থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছে। দুর্ঘটনার ঘটনায় সাবেক পরিবহন মন্ত্রীসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলেও এখনো আদালতে কোনো বিচার শুরু হয়নি। সরকার দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এরই মধ্যে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের সহিংস আচরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগও দেখা দিয়েছে। ইউরোপ কাউন্সিলসহ বিভিন্ন সংস্থা সরকারের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের নিন্দা জানিয়েছে। গত সেপ্টেম্বরের প্রাইড মিছিলে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ছোড়ে, শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, “রাষ্ট্র নিজ নাগরিকদের ওপরই নৃশংস হামলা চালিয়েছে।”
এক শিক্ষার্থী নিকোলিনা সিনজেলিচ জানান, আগস্টে এক বিক্ষোভে গ্রেপ্তারের সময় পুলিশ তাকে নির্মমভাবে প্রহার করে। তিনি বলেন, “তারা আমাদের মেরেছে, আরও মারবে—কারণ তারা জানে, তাদের সময় শেষ হয়ে এসেছে।” গত এক মাসে প্রায় এক হাজার বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুচিচ, যিনি ২০১৭ সাল থেকে ক্ষমতায় আছেন, দাবি করেছেন বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এই বিক্ষোভে ভূমিকা রাখছে এবং তিনি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রক্ষায় কঠোর অবস্থান নেবেন। তার ভাষায়, “আমরা রাষ্ট্র ধ্বংস হতে দেব না। সার্বিয়া একটি শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল দেশ।”
তবে সমালোচকদের মতে, ভুচিচ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেশটি ক্রমে এক স্বৈরশাসনের পথে এগোচ্ছে। ইতিহাসে সার্বিয়ানরা জানে কীভাবে একনায়ককে ক্ষমতা থেকে সরাতে হয়—যেমন তারা ২৫ বছর আগে স্লোবোদান মিলোসেভিচকে উৎখাত করেছিল।















