যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদানে এক নতুন দুঃস্বপ্নের সূচনা। সেনাবাহিনী তাদের শেষ ঘাঁটি দারফুরের এল-ফাশার শহর থেকে সরে দাঁড়িয়েছে এখন শহরটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আধাসামরিক র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ)-এর। এরই মধ্যে জাতিসংঘ ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, বলেছে, শহরজুড়ে চলছে “অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞ”।
সোমবার গভীর রাতে সেনাপ্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান আনুষ্ঠানিকভাবে সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। একদিন আগেই আরএসএফ সেনাদের প্রধান ঘাঁটি দখল করে ‘বিজয়’ ঘোষণা করেছিল।
এল-ফাশার থেকে সেনা সরে যাওয়ার পর প্রায় আড়াই লাখ মানুষ—যার অর্ধেকই শিশু—এখন আরএসএফ-এর নিয়ন্ত্রণে। ত্রাণ সংস্থাগুলোর ভাষায়, শহরটিতে চলছে বিশৃঙ্খলা, গণহত্যা, নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও হাসপাতাল ধ্বংসের মহাযজ্ঞ।
বুরহান এক বিবৃতিতে জানান, সেনাদের সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে শুধুমাত্র নিরীহ মানুষের প্রাণ বাঁচানোর জন্য। “আরএসএফ-এর হাতে শহরে চলছে পরিকল্পিত ধ্বংস, নিরপরাধদের হত্যা। আমরা চেয়েছি বাকি মানুষদের অন্তত রক্ষা করতে,” বলেন তিনি।
কিন্তু তার কণ্ঠে শোনা যায় প্রতিশোধের আগুনও—“এল-ফাশারে আমাদের মানুষের রক্ত বৃথা যাবে না। সুদানি জাতি এই অপরাধীদের বিচারের মুখে দাঁড় করাবে।”
এই শহর পতনের মধ্য দিয়ে সুদানের নতুন বিভক্তির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে সেনাবাহিনী ও আরএসএফ-এর দ্বন্দ্ব শুরু হয় রাজধানী খার্তুমে, যা এখন পর্যন্ত ৪০ হাজারেরও বেশি প্রাণ কেড়েছে এবং ১ কোটি ২০ লাখ মানুষকে গৃহহীন করেছে।
রবিবার থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোয় দেখা যায়, আরএসএফ যোদ্ধারা সেনাঘাঁটির ভিতরে উল্লাস করছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষদের গুলি করে হত্যা ও নির্যাতন করা হচ্ছে। অনেককেই বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয়েছে অজানা গন্তব্যে।
জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “সুদানে যে যন্ত্রণা চলছে, তা আর সহনীয় নয়। এটি সংঘাতের এক ভয়াবহ নতুন অধ্যায়।”
জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তর জানিয়েছে, আরএসএফ যোদ্ধারা শহরে গণহত্যা চালাচ্ছে—পলায়নরত বেসামরিক মানুষদের হত্যা করা হচ্ছে, এবং এসব হত্যার পেছনে জাতিগত বিদ্বেষের ইঙ্গিতও স্পষ্ট।
মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ফোলকার টার্ক সতর্ক করে বলেন, “এল-ফাশারে জাতিগত ভিত্তিতে গণহত্যা ও নৃশংসতার ঝুঁকি প্রতিদিন বাড়ছে।”
সুদান ডক্টর নেটওয়ার্ক জানিয়েছে, আরএসএফ হাসপাতাল লুটপাট করে স্বাস্থ্যব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস করেছে। তাদের ভাষায়, এটি “একটি জঘন্য হত্যাযজ্ঞ”, যা শহরের প্রাণরক্ষাকারী অবকাঠামোকেও মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে।
ডারফুর নেটওয়ার্ক ফর হিউম্যান রাইটস জানায়, আরএসএফ এক হাজারেরও বেশি বেসামরিক নাগরিককে আটক করেছে, যাকে তারা বলছে “যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পৌঁছানো একটি সংগঠিত অভিযান”।
গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন একজন স্থানীয় সাংবাদিক—যিনি শহরের শেষ কর্মরত সংবাদকর্মীদের একজন। সুদানি সাংবাদিক ইউনিয়ন আশঙ্কা করছে, এল-ফাশারেও জেনেইনার মতো গণহত্যার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে, যেখানে ২০২৩ সালে শত শত মানুষকে হত্যা করেছিল আরএসএফ।
সুদান ডক্টরস ইউনিয়ন বলেছে, “এল-ফাশার এখন একটি রক্তক্ষয়ী হত্যাক্ষেত্র। এটি আরএসএফ-এর নৃশংস নীতি, যার লক্ষ্য মানুষের মাঝে ভয় ছড়িয়ে দেওয়া এবং তাদের নিশ্চিহ্ন করা।” তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে—আরএসএফ-কে “সন্ত্রাসী সংগঠন” হিসেবে ঘোষণা করতে।
নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিলের কর্মকর্তা ম্যাথিল্ডে ভু বলেন, “আমরা ২৪ ঘণ্টা ধরে এল-ফাশারে থাকা আমাদের সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছি, কিন্তু কোনো খবর পাচ্ছি না। এটি ভয়াবহ পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।”
তিনি বলেন, “এখন এল-ফাশারে কেউই নিরাপদ নয়। হত্যাকাণ্ড, অপহরণ, গণধর্ষণ—সবই ঘটছে। মানবতা সেখানে নির্বাসিত।”
জাতিসংঘ জানিয়েছে, শহরটিতে ২ লাখ ৬০ হাজার মানুষ আটকা পড়েছিল, যাদের অর্ধেকই শিশু। ইতোমধ্যে অন্তত ২৬ হাজার মানুষ পালিয়ে গ্রামাঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছে।
অন্যদিকে, সপ্তাহান্তে মধ্য কোরদোফানের বারা শহরেও আরএসএফ হামলা চালিয়ে অন্তত ৪৭ জনকে হত্যা করেছে, যাদের মধ্যে নয়জন নারী।
২০০০-এর দশকে ডারফুরে ত্রাস ছড়ানো ‘জানজাওয়িদ’ মিলিশিয়া থেকেই গড়ে উঠেছিল এই আরএসএফ। আজ তারাই আবার রক্তে রাঙাচ্ছে সুদানকে—যেখানে দুর্ভিক্ষ, গৃহযুদ্ধ ও অনাহার মিলেমিশে তৈরি করেছে পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকট।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত জানিয়েছে, তারা ইতোমধ্যেই এই সংঘাতকে ঘিরে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত শুরু করেছে।
















