রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সোমবার মস্কোয় উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী চো সন হুইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন, যা দুই দেশের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতার সাম্প্রতিক নিদর্শন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া—উভয় দেশই পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে থেকে একে অপরের প্রতি আরও নিবিড় সহযোগিতা গড়ে তুলছে।
রুশ রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, পুতিন ক্রেমলিনে হাসিমুখে চো সন হুইকে স্বাগত জানাচ্ছেন। বৈঠকে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভও উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে পুতিন বলেন, দুই দেশের “সম্পর্ক ও উন্নয়নের অগ্রগতি পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোচ্ছে” এবং তিনি উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের প্রতি শুভেচ্ছা জানান। উত্তরে চো সন হুই কিমের পক্ষ থেকে পুতিনের জন্য উষ্ণ অভিনন্দন বার্তা পৌঁছে দেন এবং দুই দেশের মধ্যে “আত্মিক ঘনিষ্ঠতা”র কথা উল্লেখ করেন।
রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বহুমাত্রিক সহযোগিতার পথে এগিয়েছে। ২০২৪ সালে তারা একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে, যেখানে বলা হয়, যে কোনো দেশের আগ্রাসনের মুখে তারা একে অপরকে সামরিক সহায়তা দেবে।
এই চুক্তির পর থেকেই উত্তর কোরিয়া প্রায় ১০,০০০ সৈন্য রাশিয়ার ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠিয়েছে বলে জানা যায়। সিউল ও কিয়েভের হিসাব অনুযায়ী, এর মধ্যে অন্তত ৬০০ জন যুদ্ধে নিহত হয়েছেন।
গত এপ্রিল মাসে প্রথমবারের মতো পিয়ংইয়ং তাদের সৈন্যদের অংশগ্রহণ স্বীকার করে, জানায় যে রুশ বাহিনীকে ইউক্রেনের পাল্টা আক্রমণের পর কুরস্ক অঞ্চলের পুনর্দখলে সাহায্য করেছে উত্তর কোরিয়ার সেনারা।
কয়েক দিন আগে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন পিয়ংইয়ংয়ে নিহত সৈন্যদের স্মরণে একটি জাদুঘরের উদ্বোধন করেন। তিনি বলেন, এই যুদ্ধে তাদের অংশগ্রহণ “যোদ্ধা সংহতির নতুন ইতিহাসের সূচনা করেছে,” যা রাশিয়ার সঙ্গে একটি “অজেয় জোট” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
গত সেপ্টেম্বর মাসে পুতিন ও কিম জং উন বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আয়োজিত সামরিক কুচকাওয়াজে একসঙ্গে অংশগ্রহণের পর আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেন। সেই সময় পুতিন উত্তর কোরিয়ার সৈন্যদের “অসাধারণ সাহসী ও বীরত্বপূর্ণ” ভূমিকার প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, “আমরা কখনো ভুলব না, তোমাদের সেনারা ও তাদের পরিবার যে ত্যাগ স্বীকার করেছে।”
তবে রাশিয়া-উত্তর কোরিয়া সম্পর্কের এই গভীরতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ বাড়ছে। ওয়াশিংটন জানিয়েছে, রাশিয়া এখন উত্তর কোরিয়ার প্রযুক্তি উন্নয়ন, বিশেষ করে মহাকাশ ও স্যাটেলাইট কর্মসূচিতে, সাহায্য করছে।
পুতিন ও কিমের সেপ্টেম্বরের বৈঠকের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তবে ক্রেমলিন এই অভিযোগ “নিরর্থক” বলে উড়িয়ে দেয়।
রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার এই বন্ধুত্ব এখন শুধু কূটনৈতিক বা সামরিক নয়, বরং এক গভীর প্রতীকী বন্ধন—যেখানে যুদ্ধ, সংকট ও পশ্চিমা চাপের মাঝেও দুই রাষ্ট্র নিজেদের ভাগ্যকে এক স্রোতে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মস্কোর শীতল প্রাসাদে করমর্দনের সেই মুহূর্ত যেন বিশ্বের সামনে এক নতুন বাস্তবতা—যেখানে ইতিহাসের দুই প্রান্ত আবারও মিলিত হচ্ছে শক্তি, প্রতিরোধ ও অস্তিত্বের লড়াইয়ের সুরে।
















