যুদ্ধে প্রতিপক্ষের নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়ার কৌশল বহুদিনের। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের অভিজ্ঞতা বলছে, নেতৃত্ব ‘শিরচ্ছেদ’ কৌশল স্বল্পমেয়াদে রাজনৈতিক সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে বিপর্যয় ডেকে আনে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি হত্যার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু তাৎক্ষণিক সাফল্যের বার্তা দিলেও এর পরিণতি ভিন্ন হতে পারে।
৮৬ বছর বয়সী খামেনি অসুস্থতার কারণে উত্তরসূরি নির্ধারণের প্রস্তুতি আগেই শুরু করেছিলেন। ফলে তাকে হত্যা মানেই এমন নেতৃত্ব আসবে, যা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে—এমন ধারণার ভিত্তি দুর্বল। বরং ইতিহাস দেখায়, এ ধরনের হত্যাকাণ্ড প্রায়ই আরও কঠোর বা উগ্র নেতৃত্বের পথ খুলে দেয়, কিংবা সৃষ্টি করে অস্থিতিশীলতা।
ইরাকের সাবেক শাসক সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর দেশটিতে যে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়, তা ইরানপন্থী শক্তির উত্থান ঘটায়। পরবর্তী সময়ে ইরাক হয়ে ওঠে আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক গঠনের ক্ষেত্র। একই সঙ্গে সেখানকার অস্থিরতা থেকে জন্ম নেয় আইএসআইএল, যা গোটা অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তোলে।
ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাসের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। প্রতিষ্ঠাতা শেখ আহমেদ ইয়াসিন ও পরবর্তী নেতা আবদেল আজিজ রান্তিসিকে হত্যা করার পর সংগঠন দুর্বল না হয়ে বরং নতুন নেতৃত্বে আরও সংগঠিত হয়। পরবর্তীতে ইয়াহইয়া সিনওয়ারের নেতৃত্বে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা সংঘটিত হয়।
লেবাননের হিজবুল্লাহতেও নেতৃত্ব হত্যার পর আরও শক্তিশালী নেতৃত্বের উত্থান ঘটে। আব্বাস আল-মুসাওয়িকে হত্যার পর হাসান নাসরাল্লাহ সংগঠনকে প্রভাবশালী শক্তিতে রূপ দেন।
ইরানের ক্ষেত্রেও আশঙ্কা করা হচ্ছে, খামেনির স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তি হয়তো আলোচনায় আগ্রহী নাও হতে পারেন। সাম্প্রতিক আলোচনায় ইরান পারমাণবিক বিষয়ে কিছু ছাড় দিতে প্রস্তুত ছিল বলে ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। নতুন নেতৃত্ব সেই রাজনৈতিক পরিসর পাবে কি না, তা অনিশ্চিত।
যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে দেওয়ার পথে এগোয়, তবে ইরাকে বা লিবিয়ায় দেখা নিরাপত্তা শূন্যতার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তার প্রভাব পড়বে উপসাগরীয় দেশগুলো ও ইউরোপ পর্যন্ত।
নেতানিয়াহুর জন্য এই হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিকভাবে তাৎক্ষণিক লাভ বয়ে আনতে পারে, বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপে থাকা অবস্থায়। তবে ট্রাম্পের জন্য লাভ ততটা স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট চলাকালে দূরবর্তী এক যুদ্ধে বিপুল অর্থ ব্যয় জনমনে প্রশ্ন তুলতে পারে।
যদি স্থলসেনা মোতায়েন না করে শুধু বোমাবর্ষণ চালানো হয়, একসময় তা শেষ করতেই হবে। তখন আঞ্চলিক মিত্রদের কাঁধেই অস্থিতিশীলতার বোঝা পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের জোট সম্পর্কও চাপে পড়তে পারে।
অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, নেতৃত্ব হত্যার কৌশল তাৎক্ষণিক সাফল্য দেখালেও দীর্ঘমেয়াদে নতুন সংঘাত, উগ্রতা ও অস্থিতিশীলতার জন্ম দেয়। ইরানের ক্ষেত্রেও সেই ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
















