ক্যারিবীয় সাগরের বুকজুড়ে এক দানবীয় শক্তি জন্ম নিচ্ছে—তার নাম মেলিসা। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, মেলিসা দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করছে, রোববার বিকেলের মধ্যেই এটি বিরল এক ক্যাটাগরি-৫ ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে।
শনিবার বিকেলে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে কেন্দ্রটি জানায়, “এই পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ—জ্যামাইকা জুড়ে তীব্র বৃষ্টিপাত, প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়া এবং ভয়ংকর জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা রয়েছে। সময় ফুরিয়ে আসছে, প্রস্তুতি এখনই শেষ করতে হবে।”
বর্তমানে ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্র জ্যামাইকার দক্ষিণ–দক্ষিণ-পূর্বে মাত্র ১২৫ মাইল দূরে অবস্থান করছে এবং এটি প্রতি ঘণ্টায় মাত্র পাঁচ মাইল বেগে অগ্রসর হচ্ছে—অর্থাৎ প্রায় থেমে থাকা অবস্থায়ই এর শক্তি বাড়ছে।
জ্যামাইকার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ড্রু হোলনেস জনগণকে সতর্ক করে বলেছেন, “এই ঝড়কে হালকা করে দেখবেন না। এখনই নিজেকে এবং আপনার পরিবারকে সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা নিন।”
ঘূর্ণিঝড় মেলিসা যেন এক ত্রিমাত্রিক বিপর্যয়—বৃষ্টি, বাতাস, আর সাগরের ঢেউ। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, সোমবার রাত বা মঙ্গলবার ভোরে এটি জ্যামাইকার উপকূলে আঘাত হানতে পারে, সম্ভবত দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় হয়ে।
এই ধ্বংসযজ্ঞের পূর্বাভাসের আগেই দক্ষিণ হাইতি ও ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রে বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত চারজনের মৃত্যু হয়েছে। হাজারো মানুষ ইতিমধ্যে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, মেলিসা এখন ক্যাটাগরি-৩ ঘূর্ণিঝড় হলেও, রোববারের মধ্যেই এটি ক্যাটাগরি-৪ বা তারও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে। জ্যামাইকা ও দক্ষিণ হাইতির কিছু এলাকায় মঙ্গলবার পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৩০ থেকে ৪০ ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে। পূর্ব কিউবায়ও ভারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
হাইতির সড়ক ও সেতুতে ইতিমধ্যেই ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দেশের নাগরিক সুরক্ষা সংস্থা বলছে, এটি এক জীবনঘাতী পরিস্থিতি, এখনই ঘরবাড়ি ও সম্পদ রক্ষার পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
জ্যামাইকায় ঘূর্ণিঝড়ের প্রস্তুতি চলছে যুদ্ধকালীন তৎপরতায়। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সব সরকারি হাসপাতালকে জরুরি অবস্থায় রাখা হয়েছে—বাহিরে রোগী দেখা বন্ধ, জরুরি শয্যা খালি রাখা হচ্ছে। পরিবহন মন্ত্রী ড্যারিল ভাজ জানিয়েছেন, শনিবার রাতের পর কিংস্টনের নরম্যান ম্যানলি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ থাকবে।
আবহাওয়া দপ্তরের পরিচালক ইভান থম্পসন সতর্ক করে বলেছেন, “এই ঘূর্ণিঝড় থামবে না, বসে থাকবে, আর পানি ঢালবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। এমন অবস্থায় জ্যামাইকার কোনো জায়গাই রেহাই পাবে না।”
প্রধানমন্ত্রী হোলনেস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, “সমুদ্রের ঢেউ উপকূলের কোথাও কোথাও ১১ ফুট পর্যন্ত উঁচু হতে পারে।” তিনি নাগরিকদের আহ্বান জানিয়েছেন, “ছাদ পরীক্ষা করুন, জানালা বন্ধ রাখুন, গাছের ঝুলন্ত ডাল কেটে ফেলুন, বালির বস্তা রাখুন, আর প্লাবনপ্রবণ এলাকায় এখনই সরিয়ে যান।”
কিংস্টনের জেলেপাড়া থেকে ক্লাইভ ডেভিস বলেন, “এই ঝড় ধীরে চললেও ক্ষতি কম নয়। বেরিল এসেছিল হুড়মুড় করে, দ্রুত চলে গিয়েছিল, কিন্তু এই মেলিসা তো থামতে চায় না, তিন দিন থাকতেই এসেছে!”
শনিবার বিকেল পর্যন্ত কিংস্টনে শ্রমিকেরা শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া স্যান্ডি গালির নিচ থেকে বর্জ্য ও পলি সরাতে ব্যস্ত ছিলেন—যাতে ভারী বৃষ্টির জলে তা উপচে না পড়ে শহরকে দুই ভাগে ভাগ করে দেয়।
মেলিসার ধীরগতি এখন সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। যখন কোনো ঝড় এভাবে স্থির থাকে, তখন এক জায়গায় বৃষ্টি ঝরে দিন-রাত ধরে। ২০১৭ সালের হার্ভি বা ২০১৯ সালের ডোরিয়ান ঠিক এমন ধ্বংস ডেকে এনেছিল—চার ফুট পর্যন্ত বৃষ্টিতে টেক্সাস আর বাহামা ডুবে গিয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যারিবীয় সাগরের উষ্ণতা এখন গভীর পর্যন্ত ছড়ানো। ফলে ঠান্ডা পানি উঠে এসে ঝড়কে দুর্বল করতে পারছে না। মেলিসা এই গভীর তাপের শক্তি টেনে নিচ্ছে, যেন সাগরের বুক থেকে আগুন ধার নিচ্ছে।
গত বছর জুলাইয়ে হারিকেন বেরিল জ্যামাইকার উপর দিয়ে বয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সরাসরি আঘাত করেনি। এবার মেলিসা যেন সেই অসমাপ্ত অধ্যায় সম্পূর্ণ করতে এসেছে।
সব ইঙ্গিতই বলছে, এই মৌসুমের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্র হতে যাচ্ছে জ্যামাইকা—একটি দ্বীপ, যার চারপাশে এখন শুধু গর্জনরত সাগর, অন্ধকার মেঘ, আর এক অনিশ্চিত নিস্তব্ধতা।















