গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে উত্তর চট্টগ্রামের দুই উপজেলা রাউজান এবং রাঙ্গুনিয়ায় ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড বেড়েছে। গত বছরের আগস্ট থেকে এই বছরের অক্টোবর পর্যন্ত এই দুই এলাকায় মোট ৩১ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে রাউজানে ১৭ জন এবং রাঙ্গুনিয়ায় ১৪ জন খুন হয়েছেন। স্থানীয় প্রশাসন এই লাগামহীন অপরাধ নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে।
অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছে আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক কোন্দল, চাঁদাবাজি, ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ এবং জমি সংক্রান্ত নানা ধরনের বিরোধ।
রাউজানের চিত্র: রাজনৈতিক সহিংসতাই মূল কারণ
রাউজানে নিহত ১৭ জনের মধ্যে ১৩ জনই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার। বছরের পর বছর ধরে এই অঞ্চলে হত্যা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে আসছে।
- উল্লেখযোগ্য হত্যাকাণ্ড: গত বছরের আগস্টে আব্দুল মান্নানকে পিটিয়ে হত্যা থেকে শুরু করে এই বছরের ২৫ অক্টোবর যুবদল কর্মী মুহাম্মদ আলমগীর আলমকে গুলি করে হত্যা পর্যন্ত এই সহিংসতা অব্যাহত আছে। এর মধ্যে ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলমকে গুলি করে হত্যা, প্রকৌশলী নূর আলম বকুলকে খুন, এবং বোরকা পরা অস্ত্রধারীদের গুলিতে মো. সেলিম উদ্দিনকে স্ত্রী-কন্যার সামনে হত্যা করার মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনাও ঘটেছে।
- আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি: রাউজান থানা সূত্র মতে, চাঁদাবাজি, বালু ও মাটির ব্যবসা এবং রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জেরেই খুনোখুনি বেড়েছে। এসব ঘটনায় অর্ধশতাধিক মামলা হলেও আসামি গ্রেপ্তারের সংখ্যা খুবই নগণ্য।
- পুলিশের ভাষ্য: রাউজান থানার ওসি মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া স্বীকার করেছেন যে রাউজানে পরিকল্পিত এবং তাৎক্ষণিক উভয় ধরনের হত্যাকাণ্ড বেড়েছে। তিনি বলেন, অন্যান্য অপরাধ দমন করা সহজ হলেও হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধ করা কঠিন। তবে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
রাঙ্গুনিয়ার পরিস্থিতি: পারিবারিক কলহ থেকে মাদক কারবার
রাঙ্গুনিয়ায় ১৪টি হত্যাকাণ্ডের কারণ আরও বিচিত্র—রাজনৈতিক প্রভাবের পাশাপাশি পারিবারিক বিরোধ, তুচ্ছ ঘটনা এবং মাদক ব্যবসা।
- অপরাধের ধরন: পারিবারিক কলহের জেরে গৃহবধূ জরিনা বেগম হত্যা, প্রকাশ্য দিবালোকে ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম তালুকদারকে কুপিয়ে হত্যা, লেবুবাগান পাহারার সময় গুলিতে আওয়াইমং মারমা নিহত হওয়া, এবং শ্বশুরকে জামাতার কুপিয়ে হত্যার মতো ঘটনা ঘটেছে।
- সাম্প্রতিক ঘটনা: ১০ জুলাই প্রবাস ফেরত মোহাম্মদ রাসেলকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যার তিন মাস পরেও রহস্য উদ্ঘাটন হয়নি। এছাড়া, আধিপত্য বিস্তার ও মাদক কারবারের বিরোধে শীর্ষ সন্ত্রাসী রুবেলকে হত্যা, যৌতুকের জন্য গৃহবধূ রুমা আক্তারকে হত্যা, এবং ইট ভাঙানোর ২০০ টাকা মজুরি নিয়ে বিরোধে দিনমজুর রহমত উল্লাহকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
- পুলিশের চ্যালেঞ্জ: দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানার ওসি সাব্বির মোহাম্মদ সেলিম জানান, থানা মাত্র দুজন এসআই দিয়ে চালাতে হচ্ছে। তারপরও মাদক ও আধিপত্য বিস্তারকেন্দ্রিক সব হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও আসামি গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। রাঙ্গুনিয়া মডেল থানার ওসি এটিএম শিফাতুল মাজদার মামলা নথিভুক্তির পর অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের চলমান অভিযানের কথা জানান।
প্রশাসনের অঙ্গীকার
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম সানতু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নতির অঙ্গীকার করে বলেছেন, তারা সতর্ক অবস্থানে আছেন এবং রাউজান-রাঙ্গুনিয়ার সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি অপরাধ দমনে পুলিশের সহায়তায় এগিয়ে আসতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।
















