নতুন প্রশাসন আকস্মিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ. মনসুরকে অপসারণ করে ব্যবসায়ী মো. মোস্তাকুর রহমানকে নিয়োগ দেওয়ার পর দেশের আর্থিক বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে এখন মূল প্রশ্ন—কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হলে বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কতটা টেকসই থাকবে?
কেন সিদ্ধান্তটি গুরুত্বপূর্ণ
মনসুরের প্রায় ১৮ মাসের দায়িত্বকালে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। প্রবাসী আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। তিনি টাকার কৃত্রিম বিনিময় হার ধরে রাখার বিপক্ষে অবস্থান নেন এবং অতিরিক্ত তারল্য নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলক উচ্চ সুদের হার বজায় রাখেন। এতে রপ্তানিকারক ও প্রবাসীদের ডলার ধরে রাখার প্রবণতা কমে আসে এবং মুদ্রাবাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফেরে।
আন্তর্জাতিক মহলে তার নীতিকে অপেক্ষাকৃত রক্ষণশীল ও পেশাদার হিসেবে দেখা হচ্ছিল। বিশেষ করে বৈদেশিক ব্যাংক ও উন্নয়ন অংশীদারদের আস্থা পুনরুদ্ধারে তার ভূমিকা আলোচিত ছিল।
নতুন নিয়োগ ও বিতর্ক
নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান বেসরকারি খাতের একজন পরিচিত উদ্যোক্তা এবং তৈরি পোশাক খাতের সঙ্গে যুক্ত। গণমাধ্যমে তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ঋণ পুনঃতফসিল সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের পর স্বার্থের সম্ভাব্য দ্বন্দ্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রভাবাধীন হয়ে পড়ে, তবে নীতিগত স্বাধীনতা দুর্বল হতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং কেবল নীতির বিষয় নয়; এটি বিশ্বাসের বিষয়ও। বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক ঋণদাতারা বর্তমান তথ্যের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নীতির ধারাবাহিকতা ও শাসন কাঠামোর স্থিতিশীলতা বিবেচনা করেন।
অর্থনীতির প্রেক্ষাপট
রিজার্ভ কিছুটা বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু আমদানি ব্যয়ের তুলনায় তা এখনও সীমিত। মূল্যস্ফীতি ধীরে কমছে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের চাপ রয়ে গেছে এবং ঋণ শ্রেণিকরণ ও তদারকি সংস্কার পুরোপুরি শেষ হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে না পারে, তবে মুদ্রানীতির বিশ্বাসযোগ্যতা দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সুদের হার কমানোর প্রশ্নে অর্থনৈতিক যুক্তি থাকতে পারে, বিশেষ করে ঋণচাপে থাকা ব্যবসাগুলোর জন্য; তবে সেই সিদ্ধান্ত অবশ্যই তথ্যনির্ভর ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিতে হবে।
আন্তর্জাতিক মাত্রা
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে চলমান কর্মসূচি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নীতি ধারাবাহিকতা নিয়ে সামান্য সন্দেহও ঋণ শর্ত, বৈদেশিক অর্থায়ন ও বাণিজ্য অর্থায়নে প্রভাব ফেলতে পারে। বৈদেশিক ব্যাংকগুলো যদি ঝুঁকি বাড়ছে মনে করে, তবে আমদানি ব্যয় ও মুদ্রার ওপর চাপ দ্রুত বাড়তে পারে।
সামনে কী
আগামী কয়েক মাস গুরুত্বপূর্ণ হবে। নতুন গভর্নর যদি ঋণ তথ্য প্রকাশে স্বচ্ছতা বজায় রাখেন, খেলাপি ঋণে শিথিলতা না দেন এবং সুদের হার বা মুদ্রানীতিতে পরিবর্তন আনলেও তা তথ্যভিত্তিকভাবে করেন, তবে বাজারের উদ্বেগ কমতে পারে।
কিন্তু যদি নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো ব্যবসায়িক বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত বলে মনে হয়, তবে এর ফল হতে পারে রিজার্ভে চাপ, মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশা বৃদ্ধি এবং বিনিময় হারে অস্থিরতা।
বাংলাদেশ গত এক দশকে শিখেছে—প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা হারাতে সময় লাগে না, কিন্তু তা ফিরিয়ে আনতে সময় ও ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা এখন শুধু নীতিগত প্রশ্ন নয়; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি।
















