জাতিসংঘের শান্তিনির্মাণ কমিশনের ২০তম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে বাংলাদেশ জার্মানি, ব্রাজিল ও ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে ভাইস-চেয়ার নির্বাচিত হয়েছে। এই নির্বাচন বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের শান্তিরক্ষা ও যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন প্রচেষ্টায় অবদানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় কূটনৈতিকভাবে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে।
শান্তিনির্মাণ কমিশন ও বাংলাদেশের ভূমিকা
২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত শান্তিনির্মাণ কমিশনের মূল কাজ সংঘাত-পরবর্তী রাষ্ট্রগুলোর পুনর্গঠন ও টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠায় পরামর্শ ও সমন্বয় করা। ৩১ সদস্যের এই প্ল্যাটফর্মে নিরাপত্তা পরিষদ, সাধারণ পরিষদ ও অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ থেকে সদস্য নির্বাচিত হয়; বাকি সদস্যরা নির্বাচিত হয় শান্তিরক্ষা মিশন ও বাজেটে অবদানের ভিত্তিতে।
বাংলাদেশ ২০০৫ সাল থেকেই কমিশনের সদস্য এবং অতীতে একাধিকবার চেয়ার ও ভাইস-চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে। বর্তমানে প্রায় চার হাজারের বেশি সেনা, পুলিশ ও বেসামরিক সদস্য নিয়ে বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অন্যতম বৃহৎ অবদানকারী। বহু বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে কাজ করতে গিয়ে প্রাণও দিয়েছেন। এছাড়া বাংলাদেশ শান্তিনির্মাণ তহবিলেও আর্থিক অবদান রাখছে।
রোহিঙ্গা সংকট: মানবিক থেকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যু
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাত ও সহিংসতার ফলে ২০১৭-১৮ সালে ব্যাপক জাতিগত নিধনযজ্ঞের পর বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা। বর্তমানে দেড় মিলিয়নের বেশি শরণার্থী কক্সবাজারে অবস্থান করছে। এই দীর্ঘস্থায়ী পরিস্থিতি বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে।
যদিও শান্তিনির্মাণ কমিশনের আনুষ্ঠানিক আলোচ্য তালিকায় মিয়ানমার নেই, তবুও বাংলাদেশ ভাইস-চেয়ার হিসেবে বিষয়টি উত্থাপনের কূটনৈতিক সুযোগ পেয়েছে।
সম্ভাব্য কৌশল
প্রথমত, রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক সমস্যা নয়, আঞ্চলিক শান্তি ও প্রতিরোধমূলক নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে উপস্থাপন করা যেতে পারে। কমিশনের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকে রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হলে বিষয়টি প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব পাবে এবং নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদের নজরে আসবে।
দ্বিতীয়ত, রাখাইন রাজ্যের জন্য একটি পরামর্শমূলক কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এতে নাগরিকত্ব ও আইনি মর্যাদা, নিরাপত্তা খাত সংস্কার, আন্তঃজাতিগত পুনর্মিলন এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের রূপরেখা থাকতে পারে। এটি বাধ্যতামূলক না হলেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নির্ধারণে সহায়ক হবে।
তৃতীয়ত, শান্তিনির্মাণ তহবিলের মাধ্যমে কক্সবাজারে শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সামাজিক সংহতি রক্ষা, যুবকদের চরমপন্থা থেকে দূরে রাখা এবং জীবিকা স্থিতিশীল করার প্রকল্পে সহায়তা চাওয়া যেতে পারে। ভবিষ্যতে রাখাইনে পরিস্থিতি উন্নত হলে প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতিও নেওয়া সম্ভব হবে।
চতুর্থত, শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে রাখাইনে সম্ভাব্য বেসামরিক সুরক্ষা বা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার বিষয়ে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, যাতে স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হয়।
শান্তিনির্মাণ কমিশনে বাংলাদেশের নেতৃত্ব তার আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতিফলন। একই সঙ্গে এটি রোহিঙ্গা সংকটকে বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তার আলোচনায় আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ। কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্মাণ এবং তহবিল সমর্থন নিশ্চিত করতে পারলে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের ভিত্তি গড়ে তোলা সম্ভব হতে পারে।
















