বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বহু ভারতীয় শিক্ষার্থীর কাছে দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় রুপির অবমূল্যায়ন, কঠোর ভিসানীতি এবং বিদেশে চাকরির অনিশ্চয়তা সেই স্বপ্নকে আরও ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
ঝাড়খণ্ডের ২৯ বছর বয়সী কনটেন্ট নির্মাতা প্রগতি প্রিয়া আগামী সেপ্টেম্বরে ইতালির রোমে গ্লোবাল ইকোনমিক অ্যাফেয়ার্স বিষয়ে স্নাতকোত্তর পড়তে যাচ্ছেন। কিন্তু ইউরোর বিপরীতে রুপির মূল্য কমে যাওয়ায় তার শিক্ষাঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, ঋণের বোঝা ভবিষ্যতে পরিশোধ করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে প্রায়ই দুশ্চিন্তায় ভুগতে হয়।
প্রগতির মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন ভারতের বহু মধ্যবিত্ত পরিবার। ২০২৫ সালে ১২ লাখেরও বেশি ভারতীয় শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষায় ভর্তি ছিলেন। তবে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ও নীতিগত পরিবর্তন অনেককেই বিদেশে পড়াশোনার সিদ্ধান্ত নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
শিক্ষা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের ভর্তি গত দুই বছরে প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। আগামী বছরগুলোতেও এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় সাম্প্রতিক ভর্তি মৌসুমে ভারতীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রেও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তি হ্রাস পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিসা প্রক্রিয়ার কঠোরতা এবং অভিবাসন নীতির পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রুপির অবমূল্যায়ন। গত এক বছরে মার্কিন ডলারের বিপরীতে রুপির মূল্য ১০ শতাংশের বেশি কমেছে, ফলে টিউশন ফি ও জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়েছে।
বিদেশে পড়াশোনা শেষ করার পরও পরিস্থিতি সহজ নয়। অনেক শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত দক্ষতাভিত্তিক চাকরি না পেয়ে অস্থায়ী বা গিগ অর্থনীতিনির্ভর কাজে যুক্ত হচ্ছেন। এতে বিদেশে উচ্চশিক্ষার বিনিয়োগ কতটা লাভজনক হবে, তা নিয়ে পরিবারগুলো নতুন করে হিসাব-নিকাশ করছে।
তবে বিদেশে পড়াশোনার আগ্রহ পুরোপুরি কমে যায়নি। বরং শিক্ষার্থীদের গন্তব্যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার পরিবর্তে জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, ইতালি এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তুলনামূলক কম টিউশন ফি, পড়াশোনা শেষে কাজের সুযোগ এবং কম খরচ এসব দেশের প্রতি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করছে।
প্রগতি প্রিয়াও একই কারণে ইতালিকে বেছে নিয়েছেন। তার মতে, যুক্তরাজ্যের তুলনায় ইতালিতে খরচ প্রায় অর্ধেক এবং যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার সময় ও ব্যয় দুটিই অনেক বেশি।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, ভারতীয় শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে গেলে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোর উচ্চশিক্ষা খাতও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। কারণ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
















