তথ্য ভাগাভাগি, ব্যবহারকারীর সম্মতি ও বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা মডেল ঘিরে আইনি লড়াই
ভারতে হোয়াটসঅ্যাপের ২০২১ সালের গোপনীয়তা নীতি দেশটির সর্বোচ্চ আদালতে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এই মামলায় শুধু একটি নীতির বৈধতাই নয়, বরং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, ব্যবহারকারীর পছন্দের অধিকার এবং প্রভাবশালী অনলাইন প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণের বৃহত্তর প্রশ্নও উঠে এসেছে।
সম্প্রতি হোয়াটসঅ্যাপ সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছে যে তারা ১৬ মার্চের মধ্যে আদালতের নির্দেশ মেনে ভারতীয় ব্যবহারকারীদের তথ্য কীভাবে মূল প্রতিষ্ঠান মেটার সঙ্গে ভাগ করা হবে সে বিষয়ে অধিক নিয়ন্ত্রণ দেবে। আদালতে জমা দেওয়া হলফনামায় বলা হয়েছে, ব্যবহারকারীরা চাইলে বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে তথ্য ভাগাভাগি থেকে বিরত থেকেও অ্যাপ ব্যবহার চালিয়ে যেতে পারবেন।
আদালত শুনানিতে কড়া মন্তব্য করে বলেছে, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান খেলতে পারবে না এবং সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকারকে উপহাসের সুযোগ নেই।
২০২১ সালের নীতিতে ব্যবহারকারীদের বলা হয়েছিল, অ্যাপ ব্যবহার চালিয়ে যেতে হলে মেটা সংস্থাগুলোর সঙ্গে তথ্য ভাগ করতে হবে—যা প্রতিযোগিতা কমিশনের মতে কার্যত “নাও বা ছেড়ে দাও” ধরনের প্রস্তাব। কমিশন জানায়, এতে ব্যবহারকারীদের প্রকৃত বিকল্প ছিল না।
এর আগে ২০১৬ সালের নীতিতে পুরোনো ব্যবহারকারীরা বিজ্ঞাপনের জন্য তথ্য ভাগাভাগি থেকে সরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেতেন। নতুন নীতি সেই সুযোগ বাতিল করায় ব্যাপক সমালোচনা হয়।
ভারতে প্রায় ৮৫ কোটি ৩০ লাখ ব্যবহারকারী নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ সবচেয়ে জনপ্রিয় বার্তা আদানপ্রদান মাধ্যম। বিকল্প হিসেবে সিগন্যাল, টেলিগ্রাম বা দেশীয় প্ল্যাটফর্ম থাকলেও জনপ্রিয়তায় কেউ কাছাকাছি নয়।
২০২১ সালের মার্চে প্রতিযোগিতা কমিশন তদন্তের নির্দেশ দিলে আইনি লড়াই শুরু হয়। কমিশন অভিযোগ তোলে, হোয়াটসঅ্যাপের প্রভাবশালী অবস্থান ব্যবহার করে মেটা অন্য বিজ্ঞাপন ব্যবসায়ীদের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছে।
২০২৪ সালের নভেম্বরে কমিশন মেটাকে ২৫ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করে এবং তিন মাসের মধ্যে সংশোধনী পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেয়। পাঁচ বছরের জন্য ব্যবহারকারীর তথ্য ভাগাভাগিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপেরও নির্দেশ দেওয়া হয়, যদিও পরবর্তী আপিলে সেই নিষেধাজ্ঞা স্থগিত থাকে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সংস্থাগুলো জরিমানার বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে।
শুনানিতে আদালত মন্তব্য করে, ব্যক্তিগত তথ্য জোর করে নেওয়া চুরির সামিল হতে পারে। আদালত তথ্য ভাগাভাগিতে সম্মতিভিত্তিক কাঠামো গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছে।
হোয়াটসঅ্যাপ বলেছে, ব্যক্তিগত বার্তা প্রান্ত-থেকে-প্রান্তে সুরক্ষিত এবং নতুন ব্যবস্থায় ব্যবহারকারীরা স্পষ্টভাবে বেছে নিতে পারবেন তথ্য ভাগ করবেন কি না। ভবিষ্যতের নীতিও একই মানদণ্ড মানবে বলে জানানো হয়েছে।
এদিকে ভারতের নতুন ডিজিটাল তথ্য সুরক্ষা আইনও সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ হয়েছে। আবেদনকারীদের মতে, এটি তথ্যের অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করতে পারে এবং নজরদারির অপব্যবহার সম্ভব। পাঁচ বিচারকের বেঞ্চ এ বিষয়ে শুনানি করবে।
মেটার জরিমানার বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট এখনো চূড়ান্ত রায় দেয়নি।
অনেকে মনে করেন, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যেন উন্নয়নশীল বাজারকে কেবল মুনাফার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার না করে। অন্যদিকে কিছু বিশ্লেষকের মতে, বিজ্ঞাপন ইন্টারনেটভিত্তিক ব্যবসার স্বাভাবিক অংশ এবং ব্যবহারকারীরা অসন্তুষ্ট হলে বিকল্প প্ল্যাটফর্মে যেতে পারেন।
এই মামলার রায় শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না—বরং ভারতে ডিজিটাল অধিকার ও তথ্য নিয়ন্ত্রণের দিকনির্দেশনাও স্পষ্ট করতে পারে।
















