নতুন সরকারের সামনে প্রশ্ন—রোহিঙ্গাদের বোঝা, নাকি কৌশলগত ও নৈতিক অগ্রাধিকার?
টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য কূটনীতি, মানবিক নীতি ও আঞ্চলিক নেতৃত্ব জরুরি
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনকে অনেকেই গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন। তবে কক্সবাজারের শিবিরে আশ্রিত ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্য এটি আরেকটি সম্ভাবনার জানালা হতে পারে। সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করবে নতুন সরকার রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেবল ব্যবস্থাপনার দায় হিসেবে দেখে নাকি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ও নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করে।
বহু বছর ধরে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্র হলেও বাস্তবে তারা প্রায়শই রাজনৈতিক কৌশলের অংশে পরিণত হয়েছেন। প্রত্যাবাসনের প্রতিশ্রুতি অনেক সময় অভ্যন্তরীণ জনমত, দাতা সংস্থা বা কূটনৈতিক বার্তা দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু একটি নতুন ম্যান্ডেট পাওয়া সরকার আগের তুলনায় নীতি উদ্ভাবনে বেশি রাজনৈতিক পরিসর পায়।
চ্যালেঞ্জের মাত্রা বিশাল। ২০১৭ সালের সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বড় অংশ এখনও বাংলাদেশে অবস্থান করছে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় খাদ্য রেশন ও মৌলিক সেবায় কাটছাঁট হয়েছে। শিবিরে চলাচল সীমিত, আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান নিষিদ্ধ, আর একটি প্রজন্ম স্বীকৃত শিক্ষা ও আইনি পরিচয় ছাড়া বড় হচ্ছে।
সব রাজনৈতিক দলই প্রত্যাবাসনকে চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরে। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান সংকটকে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন এমন এক রোগের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এতে একটি বাস্তবতা ফুটে ওঠে—এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে অনির্দিষ্টকাল বহন করা বাংলাদেশের পক্ষে কাঠামোগতভাবে কঠিন।
তবে বর্তমান মিয়ানমার পরিস্থিতিতে দ্রুত ও ব্যাপক প্রত্যাবাসন ঝুঁকিপূর্ণ। রাখাইন রাজ্যে অস্থিতিশীলতা, নাগরিকত্ব অস্বীকার এবং বিভিন্ন পক্ষের নিয়ন্ত্রণ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। তাই প্রত্যাবাসন কেবল রাজনৈতিক ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না থেকে ধাপে ধাপে যাচাইযোগ্য শর্তের ভিত্তিতে হওয়া প্রয়োজন—যেমন নাগরিকত্ব নিশ্চিতকরণ, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ, নিরস্ত্রীকৃত প্রত্যাবাসন এলাকা এবং জোরপূর্বক উচ্ছেদের বিরুদ্ধে নিশ্চয়তা।
বাংলাদেশ আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাও নিতে পারে। মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি আসিয়ানভুক্ত দেশ, চীন ও ভারতের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতা সবার স্বার্থেই প্রয়োজন।
অভ্যন্তরীণ নীতিতেও পরিবর্তন জরুরি। শিবিরে শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো, মিয়ানমারের পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষা চালু করা, সীমিত জীবিকাভিত্তিক কর্মসূচি অনুমোদন এবং সঠিক নথিপত্র প্রক্রিয়া জোরদার করলে ভবিষ্যৎ প্রত্যাবাসন স্বেচ্ছাসম্মত ও মর্যাদাপূর্ণ হতে পারে। এসব পদক্ষেপ স্থায়ী একীভূতকরণ নয়; বরং মানবিক মর্যাদা রক্ষা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি কমানোর বাস্তবধর্মী উপায়।
একই সঙ্গে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ স্বীকার করতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে ন্যায্য দায়িত্ব বণ্টন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের নৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইলে অধিকারভিত্তিক শরণার্থী নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এতে দক্ষিণ এশিয়ায় নেতৃত্বের দাবিও জোরালো হবে।
নির্বাচন একা রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান নয়। তবে এটি সংকটকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার সুযোগ দেয়। প্রত্যাবাসনকে যদি রাজনৈতিক নাটক না বানিয়ে বাস্তবসম্মত, অধিকারনির্ভর পথরেখায় রূপ দেওয়া যায়, তবে একদিন রোহিঙ্গা পরিবারগুলো নাফ নদী পার হবে নাগরিকত্বের কাগজ হাতে, আইনের সুরক্ষা নিয়ে—চাপ বা ভ্রান্ত আশ্বাসের ভিত্তিতে নয়, বরং মর্যাদার সঙ্গে।
















