দুর্নীতি ও প্রভাব বাণিজ্যের পাল্টাপাল্টি অভিযোগে বিচারিক বিশ্বাসযোগ্যতা চাপে
স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্ত ছাড়া আস্থা পুনর্গঠন কঠিন—বিশ্লেষকদের মত
বাংলাদেশের পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশন টিমের ভেতরে গুরুতর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ সামনে আসায় বিচারিক প্রক্রিয়ার নৈতিক ভিত্তি ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।
এই ট্রাইব্যুনালই এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছিল—যা দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। এখন প্রশ্ন উঠছে, বিচার প্রকৃত অর্থে হয়েছে, নাকি কেবল বিচার প্রদর্শিত হয়েছে?
প্রসিকিউশনের ভেতর থেকেই বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন অ্যাডভোকেট বি এম সুলতান মাহমুদ। তাঁর দাবি, সাবেক প্রধান প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের আমলে রাষ্ট্রীয় সাক্ষী বানানোর প্রক্রিয়ায় আর্থিক সমঝোতার ঘটনা ঘটেছে। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু উচ্চপ্রোফাইল মামলায় আসামিদের রাষ্ট্রীয় সাক্ষী বানানোর আড়ালে আর্থিক লেনদেন হয়েছে।
মাহমুদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে রাষ্ট্রীয় সাক্ষী করার ক্ষেত্রে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। আরও একটি মামলায় অভিযুক্তের আত্মীয় অর্থভর্তি ব্যাগ নিয়ে প্রসিকিউটরের দপ্তরে প্রবেশ করেছিলেন বলে অভিযোগ তোলেন তিনি। বিষয়টি তৎকালীন প্রধান প্রসিকিউটরের নজরে আনা হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে তাঁর দাবি। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট আসামিকে রাষ্ট্রীয় সাক্ষী করা হয় এবং তিনি খালাস পান।
মাহমুদ আরও অভিযোগ করেন, ভিডিও প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়নি, প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া নাম উপেক্ষা করা হয়েছে এবং অভিযোগপত্রের পরিধি ইচ্ছাকৃতভাবে সংকুচিত করা হয়েছে—যা বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত ও জবাবদিহি সীমিত করেছে। তাঁর দাবি, একটি প্রভাবশালী ক্ষুদ্র গোষ্ঠী গুরুত্বপূর্ণ প্রসিকিউশন সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করছিল।
অন্যদিকে সাবেক প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর মতে, বিচারপ্রক্রিয়া ছিল স্বচ্ছ, আর এই অভিযোগগুলো ট্রাইব্যুনালের ঐতিহাসিক রায়গুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা।
তাজুল ইসলাম পাল্টা অভিযোগও তুলেছেন সুলতান মাহমুদের বিরুদ্ধে। তাঁর দাবি, মাহমুদের বিরুদ্ধে সংবেদনশীল নথি অনুমতি ছাড়া শেয়ার, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ পেশাগত অনিয়মের অভিযোগ ছিল। এ বিষয়ে তিনি আইন উপদেষ্টার কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদনও করেছিলেন বলে জানান। তাঁর ভাষ্য, অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান শুরু হওয়ার পরই মাহমুদ প্রকাশ্যে অভিযোগ তোলেন।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের আলোকে ন্যায়বিচারের পূর্বশর্ত হলো স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রসিকিউশন, সন্দেহভাজন ও সাক্ষী চিহ্নিতকরণে স্বচ্ছতা, আর্থিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ। প্রসিকিউশন নিজেই যদি দুর্নীতি ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে, তবে ট্রাইব্যুনালের বিশ্বাসযোগ্যতা অনিবার্যভাবেই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
উচ্চপ্রোফাইল রায়, বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দেওয়া রায়, শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক নজরদারির মধ্যে ছিল। বিচারপ্রক্রিয়ার গতি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছিল। সাম্প্রতিক অভিযোগ সেই উদ্বেগকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়া জনআস্থা পুনর্গঠন সম্ভব নয়। অভিযোগ মিথ্যা হলে তা নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রমাণিত হওয়া প্রয়োজন; আর যদি অভিযোগের সত্যতা মেলে, তবে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।
আইনবিশেষজ্ঞদের কথায়, ন্যায়বিচার কেবল হওয়াই যথেষ্ট নয়—তা দৃশ্যমানভাবেও নিশ্চিত হতে হবে।
















