চীনের ইতিহাসে এমন ব্যাপক সেনা শুদ্ধি অভিযান আগে দেখা যায়নি। পার্টির সাম্প্রতিক প্লেনাম অধিবেশনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে পিপলস লিবারেশন আর্মি বা পিএলএর এই বিশাল পরিসরের “পরিষ্কার অভিযান”। সরকারিভাবে নাম দেওয়া হয়েছে দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপ, কিন্তু এর আড়ালে যেন অন্য এক রহস্য দানা বাঁধছে—একটি ভয়ের, সন্দেহের ও ক্ষমতার খেলায় গড়া কাহিনি।
এই অভিযানের নেতৃত্বে রয়েছেন নতুন পিএলএ ভাইস চেয়ারম্যান ঝাং ওয়েইশেং—শানসি প্রদেশের সন্তান, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঘনিষ্ঠতম বৃত্তের মানুষ। তিনিই একসময় পিএলএর দ্বিতীয় আর্টিলারি ডিভিশনের হয়ে কাজ করতেন। তাঁর উত্থান এবং তাঁর হাতেই শুদ্ধি অভিযান—সব মিলিয়ে যেন এক বার্তা, শি নিজেরই ছায়াকে এখন পরীক্ষা করছেন।
অন্যদিকে, পিএলএর প্রথম ভাইস চেয়ারম্যান ঝাং ইউশিয়ার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তিনি পলিটব্যুরোর সদস্য, তাই তাঁকে সরানো সহজ নয়, তবে বাস্তবে তাঁকেও যেন ইতিমধ্যে মাঠের বাইরে রাখা হয়েছে। আরও আশ্চর্য বিষয়—কোনো নতুন সেনা কর্মকর্তা এবার কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদোন্নতি পাননি। অর্থাৎ, পুরো সেনাবাহিনীই যেন এখন শাসকের সন্দেহের ছায়ায়।
এই রদবদলের পটভূমিতে তাইওয়ান প্রশ্নও নতুন রূপ নিচ্ছে। আগের মতো সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত না দিয়ে বেইজিং হয়তো এখন ভাবছে এক “নরম” কৌশল—ভোট, প্রভাব আর মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের মিশ্রণ। হংকংয়ের মতোই হয়তো তাইওয়ানেও একদিন রক্তপাতহীন নিয়ন্ত্রণ চাইছেন শি।
এই কাহিনি শুরু ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে, এক বেলুন থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে চীনা “আবহাওয়া বেলুন” দেখা দিলে তৈরি হয় তোলপাড়। বলা হয়, শি তখন জানতেন না সেই অভিযানের কথা। এরপর শুরু হয় অভ্যন্তরীণ তদন্ত, সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে নেমে আসে বজ্রাঘাত।
২০২৪ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত চলেছে দ্বিতীয় দফা ঝড়। গত দুই বছরে একে একে বদলেছেন দুই প্রতিরক্ষামন্ত্রী—ওয়েই ফেংহে ও লি শাংফু। জুন ২০২৫-এ সরিয়ে দেওয়া হয় পিএলএর রাজনৈতিক কমিশনার মিয়াও হুয়াকেও। আর এখন, অক্টোবরের এই প্লেনামে, বিদায় নিয়েছেন হে ওয়েইডংসহ অনেক সেনা নেতা।
এই অভিযানের পরিধি এমন যে, চীনের ৭৬ বছরের ইতিহাসে এর সমকক্ষ কিছু নেই। শত শত কর্মকর্তা জিজ্ঞাসাবাদ বা তদন্তের মুখে। তবুও, সামরিক বিশ্লেষকরা এখনো বলছেন—পিএলএর কার্যক্রমে তেমন কোনো দৃশ্যমান দুর্বলতা দেখা যায়নি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে কি কাঁপছে সেনা-মনোবল?
প্রশ্ন উঠছে—শি কেন এমন সময় এমন ঝুঁকি নিলেন, যখন চারপাশে যুদ্ধের ছায়া—ইউক্রেন, গাজা, তাইওয়ান? কেন নিজের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠদেরই একে একে সরিয়ে দিচ্ছেন? সরকার বলছে, দুর্নীতি। কিন্তু চীনে দুর্নীতি নতুন নয়। এই তলোয়ার তো বহু বছর ধরেই ঝুলছে সবার মাথায়। তাহলে কি অন্য কোনো ভয়, হয়তো কোনো ব্যর্থ অভ্যুত্থানের গন্ধ, এই অভিযানকে জন্ম দিয়েছে?
গুজব রয়েছে, সেনাবাহিনীর ভেতরে কিছু অংশ নাকি শি-কে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছিল—মাও-যুগের লিন বিআও ঘটনার পুনরাবৃত্তি। হয়তো তারা তাইওয়ান আক্রমণের নামে এক ব্যর্থ অভিযান সাজিয়ে শি-কে দায়ী করতে চেয়েছিল। যদি সেই পরিকল্পনা সত্যি হয়, তবে শি সময়মতো তা জেনে ফেলে পুরো বোর্ডটাই পরিষ্কার করে দিয়েছেন। আর যদি এমন কিছু না থেকেও শুধু সন্দেহ থাকে, তবুও আজকের চীনে সন্দেহই যথেষ্ট অস্ত্র।
চীনের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী সবসময় রাজা নির্মাতা। পার্টি ও আর্মির সম্পর্ক রক্তে লেখা—কোনোদিন পার্টি সেনাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, আবার কোনোদিন সেনাই পার্টিকে টিকিয়ে রেখেছে। দেং জিয়াওপিং ১৯৮৯ সালে তিয়ানআনমেন পরবর্তী সময়ে সেনার শক্তিতেই নেতৃত্ব পুনর্গঠন করেছিলেন। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, সেই ভারসাম্য ভেঙে গেছে। সেনা আর সর্বশক্তিমান নয়—পার্টির অন্য অঙ্গগুলো ধীরে ধীরে জায়গা নিচ্ছে তার স্থানে।
সবশেষে, একটাই দৃশ্য স্পষ্ট—শি জিনপিং আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ক্ষমতাশালী হয়ে উঠেছেন। তাঁর চারপাশে ভয়, সন্দেহ আর অনুগত্যের ঘন মেঘ। কিন্তু ইতিহাসের ব্যঙ্গ হলো—যে নেতা সেনাবাহিনীকে দমন করে সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণে পৌঁছান, তাঁর ভাগ্যই হয়তো সবচেয়ে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে ঠিক সেই মুহূর্তে।
















