পি. কে. বালাচন্দ্রন
শেখ হাসিনা–পরবর্তী বাংলাদেশ এক বড় রাজনৈতিক রূপান্তরের দ্বারপ্রান্তে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে গঠিত নতুন সংসদের সামনে রয়েছে গণতান্ত্রিক কাঠামোর একটি বিস্তৃত রূপরেখা, যা অতীতে ক্ষমতার অপব্যবহার রোধের লক্ষ্যে প্রণীত। “জুলাই সনদ” নামে পরিচিত এই প্রস্তাবটি ২০২৫ সালের অক্টোবরে সংবিধান সংস্কার কমিশন প্রণয়ন করে এবং ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে ৬৮ শতাংশ সমর্থন পায়।
তবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, যারা সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে, জানিয়েছে যে সংসদীয় অনুমোদন ছাড়া তারা সনদ গ্রহণ করবে না। কমিশন গঠনের সময় সংসদ না থাকায় নতুন সংসদকে প্রথমে কমিশনকে স্বীকৃতি দিতে হবে বলে দলটির বক্তব্য।
জুলাই সনদের বেশিরভাগ প্রস্তাব অগ্রগামী হলেও কয়েকটি বিষয় উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে—আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা, জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী সাফল্য এবং সংখ্যালঘু কমিশনের অনুপস্থিতি। আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক শক্তি, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধির সময় দেশের শাসক ছিল। সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে আসার পেছনে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের বয়কট ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হয়।
নাগরিক পরিচয় ও ভাষা
সনদে বলা হয়েছে, নাগরিকদের পরিচয় হবে “বাংলাদেশি”, “বাঙালি” নয়। এতে দেশের বহুজাতিক বাস্তবতার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সরকারি ভাষা থাকবে বাংলা, অন্য ভাষাগুলো জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। ইংরেজিকে সহকারী সরকারি ভাষা হিসেবে উল্লেখ না করায় ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের গুরুত্ব বেড়েছে।
জরুরি অবস্থা ও মৌলিক অধিকার
বর্তমান সংবিধানে “অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা”র ভিত্তিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণার সুযোগ ছিল। সনদে তা সীমিত করে “জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার হুমকি, মহামারি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ” পর্যন্ত রাখা হয়েছে। জরুরি অবস্থায় জীবন ও ন্যায়বিচার–সংক্রান্ত মৌলিক অধিকার স্থগিত করা যাবে না।
রাষ্ট্রনীতির মৌলিক নীতিতে সমতা, মানব মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। বাংলাদেশকে বহুজাতিক, বহুধর্মীয় ও বহুভাষিক রাষ্ট্র হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
ক্ষমতার ভারসাম্য ও মেয়াদসীমা
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে—স্বাধীন কমিশনগুলোতে নিয়োগে সরাসরি ক্ষমতা দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা সর্বোচ্চ ১০ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে দলীয় প্রধান থাকতে পারবেন না।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার
নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন প্রক্রিয়া অত্যন্ত বিস্তারিত ও সময়সীমাবদ্ধ করা হয়েছে, যাতে রাজনৈতিক ঐকমত্য নিশ্চিত হয়। প্রয়োজন হলে বিচার বিভাগের প্রতিনিধিও যুক্ত হবেন।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ
বর্তমানে এককক্ষবিশিষ্ট সংসদের পরিবর্তে নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে নির্বাচিত হবে। তবে কোনো বিল স্থায়ীভাবে আটকে রাখতে পারবে না।
নারীর অংশগ্রহণ
সংসদে নারীদের আসন ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১০০ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে ৩৩ শতাংশ প্রার্থী নারী করার উদ্দেশ্য রয়েছে।
দলীয় শৃঙ্খলা ও চুক্তি অনুমোদন
আস্থা ভোট ও অর্থ বিল ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন। জাতীয় স্বার্থ বা নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক চুক্তির জন্য উভয় কক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
নির্বাচন কমিশন
নির্বাচন কমিশন গঠনে স্পিকার, উপ-স্পিকার (বিরোধী দলীয়), প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা ও আপিল বিভাগের বিচারপতি নিয়ে একটি কমিটি প্রার্থীদের যাচাই করে সর্বসম্মতিক্রমে সুপারিশ করবে।
সংখ্যালঘু কমিশনের অনুপস্থিতি
সনদে বহু স্বাধীন কমিশনের প্রস্তাব থাকলেও সংখ্যালঘু কমিশনের উল্লেখ নেই। হিন্দু ও বৌদ্ধসহ সংখ্যালঘুরা অতীতে বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছেন। এ প্রেক্ষাপটে কমিশনের অনুপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সার্বিকভাবে, জুলাই সনদ গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের একটি শক্তিশালী ভিত্তি হতে পারে। তবে রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উত্থান এবং সংখ্যালঘু সুরক্ষার ঘাটতি ভবিষ্যতে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশের নতুন অধ্যায় কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিশীল হবে, তা নির্ভর করবে এই রূপরেখার বাস্তবায়নের ওপর।
















