যুক্তরাষ্ট্রের তেল অবরোধের কারণে কিউবায় ভয়াবহ জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। জ্বালানি রেশনিং ও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় ১১ মিলিয়ন মানুষের এই দ্বীপদেশে স্বাভাবিক জীবন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসনের চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
হাভানাসহ বিভিন্ন শহরে বাসস্টপগুলো ফাঁকা পড়ে আছে। বিদ্যুৎ না থাকায় বহু পরিবার রান্নার জন্য কাঠ ও কয়লার ওপর নির্ভর করছে। টানা লোডশেডিংয়ের মধ্যে অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ।
এই প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াস-কানেল কঠোর জরুরি ব্যবস্থা ঘোষণা করেছেন। অফিস সময় কমানো, জ্বালানি বিক্রি সীমিত করা এবং বিভিন্ন খাতে কার্যক্রম সংকুচিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে সরকার পরিবর্তনের হুমকির মধ্যেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হলো।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্র আটক করার পর থেকেই ক্যারিবীয় অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা বাড়ে। কিউবার ঘনিষ্ঠ মিত্র ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিন দেশটিকে জ্বালানি সরবরাহ করে আসছিল। তবে এখন সেই সরবরাহ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
কিউবার উপপ্রধানমন্ত্রী অস্কার পেরেজ-অলিভা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে জানান, সীমিত জ্বালানি ব্যবস্থাপনার মধ্যেও দেশের মৌলিক সেবা ও জরুরি কার্যক্রম চালু রাখাই সরকারের লক্ষ্য। তিনি বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো চার দিনের কর্মসপ্তাহে যাবে, আন্তঃপ্রাদেশিক পরিবহন কমানো হবে, বড় পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ থাকবে এবং স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থিতি সীমিত করা হবে।
সরকার জানিয়েছে, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য উৎপাদন ও প্রতিরক্ষা খাতে জ্বালানি অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কার্যক্রম সীমিত করে জরুরি প্রস্তুতি ব্যবস্থায় সম্পদ সরানো হবে।
দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় কিউবার অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মেক্সিকো, রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলার মতো মিত্রদের ওপর তেল আমদানির জন্য নির্ভরশীল ছিল দেশটি। তবে ভেনেজুয়েলার তেল কিউবায় পাঠানো ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে চাপ বাড়িয়েছে।
গত মাসে ট্রাম্প কিউবাকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি ঘোষণা করে নির্বাহী আদেশে এমন দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপ করেন, যারা কিউবায় তেল সরবরাহ করবে। এর ফলে দেশটিতে তেলের মজুত রেকর্ড পরিমাণে কমে গেছে। ট্রাম্প প্রকাশ্যে কিউবাকে ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে উল্লেখ করেন।
হাভানা এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে। কিউবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, চাপের মধ্যে নয়, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করতে আগ্রহী তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য নিয়ে স্পষ্টতা না থাকলেও দেশটির কর্মকর্তারা একাধিকবার কিউবার সরকার পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কিউবায় রাজনৈতিক পরিবর্তন দেখতে চায় ওয়াশিংটন, যদিও তা কীভাবে হবে সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
কিউবা–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ইতিহাস দীর্ঘ ও উত্তেজনাপূর্ণ। ১৯৫৯ সালে বিপ্লবের পর থেকেই কিউবার ওপর মার্কিন অবরোধ চলছে। কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞায় ওষুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিও কঠিন হয়ে পড়ে।
২০১৪ সালে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন হলেও ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তা আবার ভেঙে যায়। ২০২৫ সালে ক্ষমতায় ফিরে তিনি আগের প্রশাসনের সংলাপ নীতিও বাতিল করেন।
সম্প্রতি পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারির শেষ নাগাদ কিউবার কাছে বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী মাত্র ১৫ থেকে ২০ দিনের তেল মজুত ছিল। দেশটির দৈনিক প্রায় এক লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের প্রয়োজন।
জাতিসংঘ সতর্ক করে জানিয়েছে, কিউবার জ্বালানি সংকট মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। সংস্থাটি বহুবার যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছে এবং সব পক্ষকে সংলাপ ও আন্তর্জাতিক আইন মানার তাগিদ দিয়েছে।
হাভানায় জাতিসংঘের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘূর্ণায়মান বিদ্যুৎ বিভ্রাটে দেশের অধিকাংশ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে থাকা মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। তাদের মতে, কঠোর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে টিকে থাকতে কিউবার জন্য জরুরি পরিবর্তন এখন অপরিহার্য।
















