নির্বাচনি খরচে প্রার্থীদের নগদপ্রীতি; বিএফআইইউ-র কড়া নজরদারি ও ডিজিটাল লেনদেনে ‘রেড অ্যালার্ট’
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতিতে এক অস্বাভাবিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। নির্বাচনি প্রচার, মাঠপর্যায়ের ব্যয় এবং ভোটার তুষ্ট করার প্রচেষ্টায় প্রার্থীরা ব্যাংক থেকে দেদারসে নগদ টাকা উত্তোলন করছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাত্র দুই মাসে (ডিসেম্বর ও জানুয়ারি) ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। যেখানে গত বছরের নভেম্বরে এই অঙ্ক ছিল ২.৬৯ লাখ কোটি টাকা, জানুয়ারিতে তা লাফিয়ে ৩.১০ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ মূলত প্রার্থীদের নির্বাচনি খরচ মেটাতে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে ধারণা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সন্দেহজনক লেনদেনের ওপর ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। একই সঙ্গে ভোটের মাঠে অর্থের অপব্যবহার রুখতে ৮ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোবাইল ব্যাংকিং ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে নজিরবিহীন কড়াকড়ি আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
বিএফআইইউ-র পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দিনে ১০ লাখ টাকার বেশি লেনদেন হলেই তা বাধ্যতামূলকভাবে তাদের জানাতে হবে। ভুল তথ্য দিলে বা রিপোর্ট না করলে মানি লন্ডারিং আইনে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, নির্বাচনি ব্যয় মেটাতেই নগদ টাকা উত্তোলনের এই প্রবণতা। তবে অর্থপাচার ও কালোটাকার দাপট রুখতে ব্যাংকগুলোকে প্রতিদিনের বড় লেনদেনের তথ্য রিপোর্ট করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত বছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকের বাইরে নগদের প্রবাহ কমলেও নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার পর থেকে চিত্রটি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এই হঠাৎ উল্টো স্রোত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, নির্বাচনি ব্যয়ের বড় অংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক বা নগদে হয়। তবে এই তারল্য বৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
নির্বাচনের আগে অর্থনীতির জন্য বড় সুখবর হয়ে এসেছে প্রবাসীদের পাঠানো রেকর্ড রেমিট্যান্স। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি— এই দুই মাসে ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছে। শুধু জানুয়ারিতেই এসেছে ৩.১৭ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে একক মাস হিসেবে তৃতীয় সর্বোচ্চ।
বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে গত মঙ্গলবার ১৭১ মিলিয়ন ডলার কিনেছে। এর বিপরীতে বাজারে ছাড়া হয়েছে ২ হাজার ৯১ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এ পর্যন্ত প্রায় ৫২ হাজার ৮১০ কোটি টাকা বাজারে তারল্য হিসেবে যুক্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, রিজার্ভ বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ— এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
ভোটারদের প্রভাবিত করতে অর্থের অবৈধ ব্যবহার ঠেকাতে নির্বাচন কমিশনের অনুরোধে ৮ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ডিজিটাল লেনদেনে নজিরবিহীন বিধিনিষেধ কার্যকর হবে। এই সময়ে বিকাশ, নগদ বা রকেটে একজন গ্রাহক দিনে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা লেনদেন করতে পারবেন এবং প্রতিটি একক ট্রানজেকশনের সীমা হবে মাত্র ১ হাজার টাকা। একই সঙ্গে ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে (P2P) অর্থ স্থানান্তর সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে।
নির্বাচনি মাঠে পোস্টার ও মিছিলের আড়ালে এই বিশাল ‘শ্যাডো ইকোনমি’ বা অদৃশ্য অর্থনীতি গণতন্ত্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাজনীতিকে ‘বিনিয়োগ’ হিসেবে দেখার প্রবণতাই কালোটাকার মূল উৎস। এই দুষ্টচক্র ভাঙতে ভোটারদের সচেতনতা এবং কমিশনের কঠোর নজরদারি এখন সময়ের দাবি।















