চীননির্ভরতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের জোগান ও বাণিজ্য কাঠামো নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। স্মার্টফোন থেকে শুরু করে আধুনিক অস্ত্র, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও সেমিকন্ডাক্টর তৈরিতে ব্যবহৃত এসব খনিজের ক্ষেত্রে চীনের প্রভাব মোকাবিলাই এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।
বুধবার ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ বিষয়ক মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং কঙ্গোর গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রসহ একাধিক দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বৈঠকে কম্পিউটার চিপ, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি ও আধুনিক প্রযুক্তি উৎপাদনে প্রয়োজনীয় খনিজের প্রাপ্যতা ও বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ে আলোচনা হয়। বিরল মৃত্তিকা ধাতুসহ এসব খনিজের খনন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে বর্তমানে চীনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রকাশিত বক্তব্যে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সরাসরি চীনের নাম উল্লেখ না করলেও বিদেশি উৎস থেকে আসা খনিজের কারণে বৈশ্বিক বাজারে দাম পড়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। ভ্যান্স বলেন, অতিরিক্ত সরবরাহের ফলে অন্য দেশগুলোর পক্ষে বিনিয়োগ টানতে সমস্যা হচ্ছে, যা খনিজ উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করছে।
তিনি জানান, গুরুত্বপূর্ণ খনিজের দাম অতিরিক্ত কমে যাওয়া ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক আরোপের পথ বেছে নিতে পারে, যাতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বজায় থাকে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর বিশেষ সহকারী ডেভিড কপলি বলেন, খনিজ খাতে প্রকল্প চালু করতে যুক্তরাষ্ট্র শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে চায়। এরই মধ্যে বিরল মৃত্তিকা চুম্বক উৎপাদনকারী এমপি ম্যাটেরিয়ালস এবং ব্যাটারি উপাদান প্রস্তুতকারী লিথিয়াম আমেরিকাসসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার জানান, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপীয় কমিশন যৌথভাবে সমন্বিত বাণিজ্য নীতি ও ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরির কাজ করছে, যাতে ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের জোগান নিয়ে সংকট এড়ানো যায়।
বৈঠকের আগে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, দেশগুলোর উচিত বাজার অর্থনীতির নীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিধি অনুসরণ করা এবং এ বিষয়ে পারস্পরিক সংলাপ ও যোগাযোগ জোরদার করা।
এই উদ্যোগকে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যার লক্ষ্য হলো বাণিজ্য আলোচনায় চীনের খনিজ আধিপত্যকে চাপ হিসেবে ব্যবহারের ক্ষমতা খর্ব করা।
এর আগে সোমবার ট্রাম্প প্রশাসন প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ মজুত প্রকল্প ‘প্রজেক্ট ভল্ট’ চালুর ঘোষণা দেয়। শিল্পখাতের প্রতিনিধিরা এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন। অ্যাডভান্সড ম্যাগনেট ল্যাবের প্রেসিডেন্ট ওয়েড সেন্টি বলেন, খনিজ ও বিরল মৃত্তিকা সরবরাহ সুরক্ষিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের দৃঢ় পদক্ষেপ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
উল্লেখ্য, এই বৈঠকের দিনই ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং–এর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন, যা তিনি ইতিবাচক বলে বর্ণনা করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিরল মৃত্তিকা ধাতু রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে চীন তার প্রভাব আরও জোরদার করেছে। যদিও পরে কিছু শিথিলতা আনা হয়, তবুও বাণিজ্য আলোচনায় এসব খনিজকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে বেইজিং—এমনটাই ধারণা পর্যবেক্ষকদের।
















