ক্রিকেট ইতালিতে এসেছে প্রায় দুই শতাব্দী আগে। এত দীর্ঘ সময় পেরিয়ে এবার প্রথমবারের মতো আইসিসি পুরুষ টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলতে যাচ্ছে ইতালি। টুর্নামেন্টের শুরুতেই স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে দলটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন প্রত্যাশা ও কৌতূহল।
শ্রীলঙ্কার নেগোম্বোর কাছে মারাওইলা গ্রামের রাস্তায় ছোটবেলায় ক্রিকেট খেলেই বড় হন ক্রিশান কালুগামাগে। পারিবারিক আর্থিক সংকট আর সীমিত সুযোগের কারণে মাত্র ১৫ বছর বয়সে বাবা–মায়ের সঙ্গে ইতালির তাসকানিতে পাড়ি জমান তিনি। তখনো ভাবেননি, দুই দশকের বেশি সময় পর আবার ব্যাগ গুছিয়ে ক্রিকেটার হিসেবেই ফিরবেন উপমহাদেশে, তবে এবার ইতালির জার্সি গায়ে।
ইতালিতে ক্রিকেটের শিকড় খুব পুরোনো হলেও এর বিকাশ হয়েছে ধীরে। ১৮৯৯ সালে মিলান ফুটবল অ্যান্ড ক্রিকেট ক্লাব প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দেশটিতে খেলাটির সূচনা হয়। পরে ফুটবল জনপ্রিয় হলেও ক্রিকেট থেকে যায় প্রান্তিক পর্যায়ে। তবু ২০২৬ টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের ও শ্রীলঙ্কার যৌথ আয়োজনে ইতালির জায়গা করে নেওয়া দেশটির ক্রিকেট ইতিহাসে বড় মাইলফলক।
গত জুলাইয়ে ইউরোপ অঞ্চলের বাছাইপর্বে নেদারল্যান্ডসের পর দ্বিতীয় হয়ে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করে ইতালি। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ১২ রানের জয় তাদের পথ খুলে দেয়। প্রত্যাশিত শক্তিশালী দল স্কটল্যান্ডকে পেছনে ফেলে নেট রান রেটে এগিয়ে থেকে তারা বিশ্বকাপের টিকিট পায়। পরে বাংলাদেশের সরে দাঁড়ানোর কারণে স্কটল্যান্ডও শেষ মুহূর্তে সুযোগ পায়।
ইতালির সেই সাফল্যে বড় ভূমিকা রাখেন অলরাউন্ডার হ্যারি মানেন্তি। ব্যাটে দ্রুত ৩৮ রান ও বল হাতে পাঁচ উইকেট নিয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন তিনি। এমিলিও গের সংক্ষিপ্ত ঝড়ো ইনিংসও ছিল গুরুত্বপূর্ণ, যদিও চোটের কারণে তিনি বর্তমান দলে নেই।
১৬ দলের আসরে ইতালি রয়েছে সি গ্রুপে, যেখানে তাদের সঙ্গী স্কটল্যান্ড, নেপাল, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ড। গ্রুপের শীর্ষ দুই দল যাবে সুপার এইটে। দলের কোচ সাবেক আয়ারল্যান্ড আন্তর্জাতিক কেভিন ও’ব্রায়েন মনে করেন, তাদের লক্ষ্য শুধু অংশগ্রহণ নয়, বরং ম্যাচ জেতা এবং পরের ধাপে ওঠা। প্রস্তুতি হিসেবে দুবাইয়ে আয়ারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে ত্রিদেশীয় সিরিজে পারফরম্যান্স তাকে আশাবাদী করেছে।
ইতালির ১৫ সদস্যের দলে পাঁচজন খেলোয়াড় দেশটির ঘরোয়া কাঠামো থেকে উঠে এসেছেন। বাকিরা অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইংল্যান্ডে বড় হয়েছেন, তবে পারিবারিক সূত্রে ইতালির হয়ে খেলার যোগ্যতা পেয়েছেন। দলের কেউই ইতালিতে জন্মগ্রহণ করেননি, যদিও অনেকেরই ইতালিয়ান পাসপোর্ট রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ান দুই ভাই হ্যারি ও বেন মানেন্তি এবং জাস্টিন ও অ্যান্থনি মোসকা দলে আছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক আন্তর্জাতিক জেজে স্মাটসও অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার নিয়ে এসেছেন। দলের অধিনায়ক ৪২ বছর বয়সী ওয়েন ম্যাডসেন, যিনি দীর্ঘদিন ইংলিশ কাউন্টি ক্রিকেট খেলেছেন। ইংল্যান্ডের ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত খেলা গ্রান্ট স্টুয়ার্টও আছেন স্কোয়াডে।
ঘরোয়া ভিত্তির খেলোয়াড়দের মধ্যে রয়েছেন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত জাইন আলী, হাসান আলী ও সৈয়দ নাকভি এবং ভারতে জন্ম নেওয়া জসপ্রীত সিং, যিনি ইতালিতেই বড় হয়েছেন। কালুগামাগে এখন লেগ স্পিনার হিসেবে দলের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র।
দলের পরিচয় ও বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও কোচ ও’ব্রায়েন জোর দিয়ে বলেন, খেলোয়াড়দের সঙ্গে ইতালির সংস্কৃতি ও পরিচয়ের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। অনেকেই ইতালিয়ান ভাষায় সাবলীল, সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত এবং নিজেদের এই দেশটির প্রতিনিধি হিসেবেই দেখেন।
কালুগামাগের গল্প এই দলের প্রতিচ্ছবি। ইতালিতে ক্রিকেট মাঠ না থাকায় একসময় তিনি অ্যাথলেটিকসে ঝুঁকেছিলেন, এমনকি অলিম্পিক স্বর্ণজয়ী অ্যাথলেটের সঙ্গে অনুশীলনও করেন। পরে স্থানীয় ক্লাব খুঁজে পান। লুক্কা থেকে রোমা ক্রিকেট ক্লাবে খেলতে গিয়ে নিয়মিত ৭০০ কিলোমিটার যাতায়াত করেন। পেশায় পিৎজা শেফ হলেও ক্রিকেটের টানে চাকরি ছাড়তেও দ্বিধা করেননি।
বিশ্বকাপে ওঠার পর আনন্দে কেঁদেছিলেন তিনি। তার বিশ্বাস, এই মঞ্চ ইতালিতে ক্রিকেটের প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহ বাড়াবে।
কোচ ও’ব্রায়েন মনে করেন, ইতালির বর্তমান অবস্থার সঙ্গে ২০০৭ সালের আয়ারল্যান্ড দলের মিল আছে। তখন আয়ারল্যান্ডও অপ্রত্যাশিত সাফল্য দেখিয়েছিল। সেই বিশ্বাস থেকেই ইতালিও চমক দিতে চায়।
কালুগামাগের কাছে বিশ্বকাপের মঞ্চে দাঁড়ানোই স্বপ্নপূরণ। বড় দর্শকের সামনে কখনো না খেললেও তার চোখে কোনো ভয় নেই। তার কথায়, ক্রিকেটই তার জীবন।
















