ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র ৮ দিন। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে আগ্নেয়াস্ত্রর ব্যবহার ততই বাড়ছে। পাশাপাশি নির্বাচনী সহিংসতায় ব্যবহার হচ্ছে পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্রও। এমন অহরহ অস্ত্রের ব্যবহারে নির্বাচনী নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়ছে। রাজনৈতিক উত্তেজনা, প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা এবং সম্ভাব্য সহিংসতা ঘিরে সন্ত্রাসী ও অপরাধীরা অস্ত্র মজুদ রাখছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যারা নির্বাচনে সহিংসতা করে নির্বাচনী মাঠ দখলে রাখতে চায় তারাই অস্ত্র ব্যবহারের মধ্যেমে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করবে। ফলে নির্বিঘ্নে ভোট প্রদান করার ক্ষেত্রে ভয়ের কারণ হবে এই অস্ত্র। এর পাশাপাশি ২০২৪ সালে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময় দেশের বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের ১ হাজার ৩৩৫টি এখনো উদ্ধার হয়নি। লুট হওয়া এসব অস্ত্র ছিনতাই, ডাকাতির কাজে ব্যবহার করছে অপরাধীরা। পাশাপাশি এসব অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় আসন্ন সংসদ নির্বাচনের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
গত রোববার (১ জানুয়ারি) দিবাগত রাতে গুলশান থানাধীন গুদারাঘাটে চেকপোস্ট থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন ও ১০ রাউন্ড গুলিসহ সোহেল নামে এক যুবককে গ্রেফতার করা হয়। থানা পুলিশ বলছে, নির্বাচনকে সামনে রেখে বিশেষ চেকপোস্টে এই অস্ত্রসহ যুবককে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গুলিসহ খিলগাঁওয়ের ভাঙ্গারি ব্যবসায়ীর ছেলে আসাদুলকে গ্রেফতার করে র্যাব। দিনমজুরের কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা স্থানীয়দের কাছে নানা আলোচনা সমালোচনার জন্ম নেয়।
শুধু এই একটি বা দুইটি ঘটনা না, নির্বাচনের সন্নিকটে এমন অস্ত্র উদ্ধার বা অস্ত্রের মজুদের ঘটনায় নির্বাচনকেন্দ্রীক আতঙ্ক বেড়েই চলছে। এ ছাড়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মীর কাছে থাকা লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্রেরও নির্ভরযোগ্য হদিস এখনো মেলেনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা, পালিয়ে যাওয়া কিছু নেতাকর্মী এসব অস্ত্র গোপনে সংরক্ষণ করে রেখেছেন। তাদের ধারণা, ভবিষ্যতে নাশকতার কাজে এসব অস্ত্র ব্যবহৃত হতে পারে।
পুলিশ সদর দফতরের তথ্যে জানা যায়, গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দেশের বিভিন্ন থানা, ফাঁড়িসহ পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এ সময় সেসব স্থাপনা থেকে ৫ হাজার ৭৬৩টি অস্ত্র এবং সাড়ে ৬ লাখ রাউন্ড গোলাবারুদ লুট হয়। পর বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ৪ হাজার ৪২৮টি অস্ত্র ও প্রায় ৪ লাখ রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়। তবে এখনো হদিস মেলেনি ১ হাজার ৩৩৫টি অস্ত্র ও ২ লাখ রাউন্ড গোলাবারুদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, বিভিন্ন এলাকার থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গুলি কিশোর গ্যাং থেকে শুরু করে বিভিন্ন অপরাধীদের হাতে চলে গেছে। এরপর সেগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হাত বদল হয়ে ভয়ংকর পেশাদার অপরাধীদের পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। এমন কি নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে পিস্তল ও রিভলবারের মতো ক্ষুদ্রাস্ত্র সংগ্রহ করেছে অপরাধী চক্রগুলো। যা দিয়ে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার ও হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটছে।
এদিকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) অস্ত্র উদ্ধারের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই বোঝা যায় সীমান্তে অস্ত্রের জোয়ারের হিসাব। শুধুমাত্র জানুয়ারি মাসে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলা বারুদ ও বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধার করেছে বাহিনী। এর মধ্যে রয়েছে ৬৪টি পিস্তল, ২টি এসএমজি, ১৯টি হ্যান্ড গ্রেনেড, ১০টি রাইফেল, ৩টি রিভলভার, ৫৬টি বিভিন্ন প্রকার গান, ১ হাজার ৫০৯টি গোলাবারুদ, ৫৭টি ম্যাগজিন, ৮টি মর্টার শেল, ৭৩ হাজার ১০০টি সীসার গুলি, ২০ কেরির বেশি গান পাউডার, ৪টি মাইন, ৭৯টি হাত বোমা, ৪০টি পেট্রাল বোমা, ১৭৮টি ককটেল।
থেমে নেই দেশের অভ্যন্তরে অস্ত্র উদ্ধার:
পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার এক দিন আগে নির্বাচনে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এমন অপরাধীদের গ্রেফতারে ডেভিল হান্ট ফেজ ২ ঘোষণা করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এই সময়ের মধ্যে ৫৭২টি বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র ও ৮৫ হাজারের বেশি গুলি উদ্ধার করা হয়। এড়াড়া ২৪৮টি ককটেল ও ২০ বোমা উদ্ধার করে পুলিশ। একই সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করেছে সেনা বাহিনী। সেনা বাহিনীর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) জানিয়েছে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত সারা দেশে ১৭৯টি অস্ত্র ও ১ হাজার ৯৪১ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এতো উদ্ধার অভিযানের মাঝেও হদিস নেই ২০২৪ সালে থানা থেকে লুট হওয়া ১ হাজার ৩৩৫টি অস্ত্র। নির্বাচনী সহিংসতায় সন্ত্রাসীরা এসব অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, প্রভাব পড়বে নির্বাচনে:
গত ডিসেম্বরে তফসিল ঘোষণার পরদিনই দুর্বৃত্তের গুলিতে আহত হন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি। পরে তাঁর মৃত্যু হয়। তফসিল ঘোষণার পর এখন পর্যন্ত সারা দেশে অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। যাদের মধ্যে ঢাকার তেজগাঁওয় ও পল্লবীতে বিএনপির দুই অঙ্গসংগঠনের দ্ইু নেতাকে প্রকাশ্যে হত্যার ঘটনা বেশ আলোচিত ছিলো। এই দুই হত্যাকাণ্ডে অগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে। এমন কি পল্লবীতে যুবদল নেতাকে গুলির ঘটনায় আসামি মোক্তারকে গ্রেফতারের পর ডিবি তার কাছ থেকে হত্যায় ব্যবহৃত অন্তত ৫টি অস্ত্র উদ্ধার করে।
ছোট কিংবা মাঝারি যে যেকোন অস্ত্রই নির্বাচনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য হুমকি বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। তিনি বলেন, যেকোন সহিংসতায় অস্ত্র এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নেওয়ার প্রয়োজনে ছোট অস্ত্র বা সহজে বহনযোগ্য অস্ত্রের কদর বেশি। এই ধরনের অস্ত্রকে আমরা বলি, সংঘাত-সহিংসতার উপযোগী অস্ত্র। এটার ব্যবহারের কৌশলও সহজে শেখানো যায়। এই বৈশিষ্ট্যগুলোর কারণে ছোট অস্ত্রগুলোর ব্যবহার আমরা লক্ষ্য করেছি। সাম্প্রতিক সময়ের অধিকাংশ সহিংসতায় এমন ছোট অস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যারা নির্বাচনে সহিংসতা করে নির্বাচনী মাঠ দখলে রাখতে চায় তারাই অস্ত্রের ভয় ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করবে। ফলে নির্বিঘ্নে ভোট প্রদান করার ক্ষেত্রে ভয়ের কারণ হবে এই অস্ত্র। বিশেষ করে লুটকৃত অস্ত্র বা সীমান্তে দিয়ে সীমান্ত অবৈধ অস্ত্রই নির্বাচনের মত রাজনৈতিক আয়োজনের জন্য একটি ভয়ের কারণ। আমরা আগেও বলেছি, যদিও খুব একটা পরিবর্তন দেখছি না। যতটা সম্ভব এই অস্ত্র উদ্ধারের জন্য আলাদা করে অভিযান পরিচালনার প্রয়োজন ছিল।
















