আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হেয় করতে ভুয়া ‘হাহা’ প্রতিক্রিয়ার ব্যাপক ব্যবহার বাড়ছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অনলাইনে সহজেই কেনা যাচ্ছে কৃত্রিম প্রতিক্রিয়া ও অনুসারী, যা ব্যবহার করা হচ্ছে রাজনৈতিক আক্রমণ, বিদ্রুপ এবং কৃত্রিম জনমত তৈরির কাজে।
২০২৫ সালের ২০ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী অধিকারকর্মী ফেসবুকে একটি স্ক্রিনশট শেয়ার করেন, যেখানে আরেক ছাত্র অধিকারকর্মীর বিরুদ্ধে সহিংসতার আহ্বান জানানো হয়েছিল। বিষয়টি দেখে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি লেখেন, ভিন্নমত থাকলেও কারও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া জরুরি। পোস্টটি প্রকাশের পর অল্প সময়েই এতে ১০ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া পড়ে, যার মধ্যে প্রায় ৮ হাজার ৫০০টি ছিল ‘হাহা’।
পরবর্তী বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই ‘হাহা’ প্রতিক্রিয়ার অন্তত প্রতি পাঁচটির একটি এসেছে সন্দেহজনক প্রোফাইল থেকে। এসব অ্যাকাউন্টে বাংলা বা ইংরেজি ছাড়া অন্য ভাষার নাম, প্রোফাইল ছবি বা ব্যক্তিগত তথ্যের অভাব এবং এমন সব দেশ দেখানো হয়েছে, যাদের সঙ্গে পোস্টটির কোনো বাস্তব যোগসূত্র নেই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব প্রোফাইল কাকতালীয়ভাবে কোনো বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর পোস্টে আসে না। এগুলো মূলত বট অ্যাকাউন্ট, যা অনলাইনে অর্থের বিনিময়ে কেনা যায়। এই প্রতিবেদনের অংশ হিসেবে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি ভুয়া ফেসবুক প্রোফাইল ব্যবহার করে বিভিন্ন ক্লিক ফার্ম থেকে প্রায় ৩০ হাজার প্রতিক্রিয়া কেনা হয়। দেখা যায়, যেসব বট প্রোফাইল দিয়ে পরীক্ষামূলক পোস্টে প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়েছে, তার অনেকগুলোই একাধিক রাজনৈতিক নেতা, দলীয় পেজ ও প্রার্থীর পোস্টেও সক্রিয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের বট কার্যক্রম নির্বাচনের আগে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। এতে বাস্তব জনমতের সঙ্গে মিল নেই এমন একটি ধারণা তৈরি হয়, যা ভোটারদের মনোভাব প্রভাবিত করতে পারে। একই সঙ্গে এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নীতিমালারও স্পষ্ট লঙ্ঘন।
ফেসবুকের নীতিমালায় কৃত্রিমভাবে প্রতিক্রিয়া বাড়ানো, ভুয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহার বা সমন্বিত ক্লিক ফার্ম কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবু অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, এসব তৎপরতা শনাক্ত ও বন্ধ করতে প্ল্যাটফর্মটির ব্যবস্থা যথেষ্ট কার্যকর হচ্ছে না।
গত দুই মাসে ২৬৩টি ফেসবুক পোস্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অন্তত চারটি রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত গোষ্ঠী সমন্বিতভাবে ‘হাহা’ প্রতিক্রিয়া ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের পোস্টে হামলা চালাচ্ছে। এসব গোষ্ঠীর মধ্যে দুটি জামায়াতপন্থী, একটি বিএনপিপন্থী এবং একটি আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। যদিও এসব দলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো সম্পর্ক অনুসন্ধান করা হয়নি।
এই গোষ্ঠীগুলো শুধু বিদ্রুপেই সীমাবদ্ধ নয়। ফেসবুকের অ্যালগরিদম অনুযায়ী, কোনো পোস্টে ট্রলিং বা নেতিবাচক সংকেত বেশি হলে তার দৃশ্যমানতা কমে যায়। ফলে সমন্বিত ‘হাহা’ হামলা কোনো বক্তব্যকে শুধু হাস্যকর করে না, বরং তা জনসম্মুখ থেকে আড়ালেও ঠেলে দেয়।
এই ধরনের ডিজিটাল হামলা চালাতে খুব বেশি কিছু লাগে না। একটি মোবাইল ওয়ালেট, অনলাইনে পাওয়া কোনো বিক্রেতা এবং কয়েক মিনিট সময়েই হাজার হাজার প্রতিক্রিয়া কেনা সম্ভব।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২৬৩টি পোস্টে মোট প্রায় আট লাখ পঁচাশি হাজার প্রতিক্রিয়ার মধ্যে প্রায় ৬২ শতাংশই ছিল ‘হাহা’। এর মধ্যে অন্তত প্রায় ২০ হাজার প্রতিক্রিয়া এসেছে এমন প্রোফাইল থেকে, যেগুলো বট অ্যাকাউন্টের বৈশিষ্ট্য বহন করে।
এই অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, একই বট নেটওয়ার্ক বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের পেজে কৃত্রিম জনপ্রিয়তাও তৈরি করছে। বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পেজে শত শত বট অনুসারীর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রার্থীরাও একই বট অনুসারী ভাগাভাগি করছে, যা প্রমাণ করে এসব অ্যাকাউন্ট কোনো আদর্শগত সমর্থক নয়, বরং ভাড়া করা ডিজিটাল সম্পদ।
ক্লিক ফার্ম পরিচালনাকারীরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে ও বিদেশে থাকা সার্ভার থেকে এসব বট অ্যাকাউন্ট পরিচালিত হয়। দেশীয় নামের প্রোফাইল তুলনামূলক ব্যয়বহুল ও ধীরগতিতে সরবরাহ করা হয়, আর বিদেশি নামের অ্যাকাউন্ট খুব দ্রুত হাজার হাজার প্রতিক্রিয়া দিতে সক্ষম।
অনুসন্ধানকারীরা বলছেন, যা বাইরে থেকে স্বতঃস্ফূর্ত জনমত বা আদর্শিক সংঘাত বলে মনে হয়, বাস্তবে তার বড় অংশই অর্থের বিনিময়ে তৈরি করা কৃত্রিম বাস্তবতা। নির্বাচনের ঠিক আগে এই ধরনের ডিজিটাল কারসাজি জনমতকে বিভ্রান্ত করার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
















